Wednesday 30 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সতর্ক মুদ্রানীতি, ৯.৫০ শতাংশেই নীতিসুদহার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫৫

-ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সতর্ক মুদ্রানীতি অবস্থান বজায় রাখছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য হওয়ায় আপাতত নীতি সুদহার কমানোর পথে না গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি রেট যেটা ১১ শতাংশ ছিল, ১১ শতাংশই অপরিবর্তিত থাকবে এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি সাড়ে ৭ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, আমাদের পলিসি স্ট্যান্ডসে কোনো পরিবর্তন এই কোয়ার্টারে আমরা করছি না। যদিও ম্যাক্রো ইকোনমিক রিয়েলিটি নানা জিনিস ইন্ডিকেট করছে, এখানে কিছু বৈপরীত্য আছে। একটা যেমন আমরা দেখছি, আমাদের ইনফ্লেশন রেটটা গত দুই মাস তিন মাসে কিছুটা হলেও কমে আসছিল। তবে রিসেন্ট কিছু ডিসিশনের কারণে, রিসেন্ট কিছু আন্তর্জাতিক এবং ডমেস্টিক ইভেন্টের কারণে ইনফ্লেশনটা সামনের দিকে কমবে কি না, একটু অনিশ্চয়তা আমরা মনে করছি আছে। সেই প্রেক্ষিতে আসলে আমাদের পলিসি রেটগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এবং মানিটারি পলিসি কমিটি মনে করে যে কিছু অবজারভেশনের পরে, এক-দুই মাস আমরা অবজারভ করব। অবজারভ করার পরে আমাদের পলিসি রেটের ব্যাপারে নতুন করে আবার ডিসিশন নেয়া যাবে।

চলতি বছরের ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত এমপিসির ১৩তম সভায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি প্রকাশ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এমপিসির ১৪তম সভায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আগস্টে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর পর নতুন করে কোনো শিথিলতা আনা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমলেও এই হ্রাসকে এখনই টেকসই মূল্যহ্রাসের যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সরবরাহ ও ব্যয়জনিত বিভিন্ন চাপ মূল্যস্ফীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রেখেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালীর সম্ভাব্য অচলাবস্থা, নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি মূল্যের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নেমে আসাই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমার অন্যতম কারণ। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়ে গেছে। ফলে অন্তর্নিহিত মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো শক্তিশালী বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও মন্থরতা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হলেও অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের মতো উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি সূচকগুলোও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরতার চিত্র তুলে ধরেছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এসব সূচকে সামান্য পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে।

উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়, জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এসব সরবরাহগত সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয়। এ কারণে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকাসহ মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ, কৃষি, সিএমএসএমই ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে।

মুদ্রানীতির প্রভাব আর্থিক বাজারে কিছুটা দ্রুত সঞ্চালিত হলেও প্রকৃত অর্থনীতিতে এর প্রভাব এখনো সীমিত। আগস্টে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করার পর আন্তঃব্যাংক সুদহার এবং সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ড কমেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের দুর্বল চাহিদা, আমানতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধি ইল্ড কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

আগস্টে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগের দুর্বল চাহিদা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবৃতিতে উঠে এসেছে।

এদিকে, ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন জোরদার, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ শৃঙ্খলা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈদেশিক খাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ওই অর্থবছরে ব্যালান্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূলত আর্থিক হিসাবে ঘাটতির কারণে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য ঘাটতিতে চলে গেছে।
তবে এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা বৈদেশিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করছে।

আগামী দিনগুলোতে দ্রুত নয়, বরং ধীরগতির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসেও পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের আগের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ পূর্বাভাস সংশোধন করে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি কমার গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালীর সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক কঠোর মুদ্রানীতি, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ঋণ সহায়তা, কাঠামোগত সংস্কার, আর্থিক খাত শক্তিশালীকরণ এবং সুশৃঙ্খলভাবে বিনিময় হারের নমনীয়তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক লক্ষ্য হলো মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য ও আর্থিক ব্যবস্থার দৃঢ়তা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা।

বিজ্ঞাপন

বাকৃবিতে ইয়াবাসহ আটক ৪
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:৫০

আরো

সম্পর্কিত খবর