Thursday 01 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

এনআইডি’র নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার নতুন উদ্যোগ ইসি’র

নাজনীন লাকী, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৫ | আপডেট: ১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৫০

– ছবি : প্রতীকী

ঢাকা: জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংক্রান্ত নানা জটিলতা দূর করা, নাগরিকদের সেবা প্রদান প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং ডেটা সুরক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন আনছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নতুন সেবাগুলো সফলভাবে চালু করতে ইসি তাদের নিবন্ধন ফর্ম এবং সফটওয়্যারে মৌলিক পরিবর্তন আনছে। সেসঙ্গে সার্বিক তথ্য সুরক্ষা ও কারিগরি অবকাঠামো শক্তিশালী করতে ইসি তাদের বাৎসরিক পরিকল্পনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে এনআইডি উইংয়ের বিভিন্ন ক্রয় পরিকল্পনায় মোট ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে ইসির সার্বিক আইসিটি সিস্টেম সাপোর্ট, ডেটা সেন্টার রক্ষণাবেক্ষণ, অ্যান্টিভাইরাস ও নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম বাবদ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

আবেদন ও তথ্য যুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজীকরণ

এনআইডি আবেদন প্রক্রিয়ায় মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং তথ্যের শতভাগ সঠিকতা নিশ্চিত করতে কয়েকটি নতুন নিয়ম যুক্ত করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সারাবাংলাকে জানান, এতদিন প্রাতিষ্ঠানিক নামের পাশাপাশি অন্য নাম যুক্ত করার ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা দূর করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে বাবা-মায়ের নাম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে। পূর্বে ফরমে বাবা-মায়ের নাম সরাসরি হাতে বা টাইপ করে লেখা হতো, যার ফলে বানানে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যেত। জানান, নতুন পরিকল্পনায় বাবা-মায়ের এনআইডি নম্বরের মাধ্যমে সরাসরি তাদের তথ্য সিস্টেমের সাথে যুক্ত করা হবে। এছাড়া সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে, কারও একাধিক স্ত্রী থাকলে সন্তানের এনআইডিতে তাদের নিজ নিজ মায়ের নাম যুক্ত করার সুস্পষ্ট ও সহজ সুযোগ রাখা হচ্ছে।

‘ফ্যামিলি ট্রি’ গঠন ও তথ্যের সুসংহত যাচাইব্যবস্থা

সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, একটি সুসংগঠিত পারিবারিক তথ্যভান্ডার তৈরির লক্ষ্যে ১৬ বছর বয়সে নাগরিকদের প্রাথমিক নিবন্ধনের সময়ই ভাই-বোনের নাম এবং জন্ম নিবন্ধন নম্বর যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের একটি ডিজিটাল ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক কাঠামোগত ডেটাবেজ তৈরি হবে। পরবর্তীতে কোনো নাগরিক যখন এনআইডিতে কোনো ধরনের সংশোধন বা পরিবর্তন চাইবেন, তখন কমিশন সহজেই এই ফ্যামিলি ট্রির মূল তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারবে। এতে ভুয়া তথ্য প্রদান, পরিচয় গোপন বা জালিয়াতির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে এবং আবেদন নিষ্পত্তির সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।

বারকোড স্ক্যান ও প্রবীণদের জন্য রেটিনা স্ক্যান প্রযুক্তি

এনআইডির সত্যতা যাচাইকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কার্ডের সামনের অংশে বিশেষ বারকোড ভিত্তিক তথ্য যাচাই ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে ইসি। যেকোনো সাধারণ নাগরিক বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান স্মার্টফোনে সেই বারকোড স্ক্যান করেই কার্ডধারীর ছবি ও মৌলিক তথ্য দেখতে পাবেন। ফলে কোনো ব্যক্তি আসল নাকি ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করছেন, তা ঘরে বসেই মুহূর্তের মধ্যে যাচাই করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের সময় প্রবীণ, শারীরিক পরিশ্রমে নিয়োজিত ব্যক্তি বা যাদের হাতের আঙুলের ছাপ ক্ষয় হয়ে গেছে, তাদের ভোগান্তি নিরসনে বিকল্প হিসেবে রেটিনা স্ক্যান প্রযুক্তি চালুর বিষয়টি ইসি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে।

সাইবার নিরাপত্তা জোরদার ও ডার্কওয়েব নজরদারি

বিগত কয়েক বছরে এনআইডি তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নিরসনে ইসি ডার্কওয়েব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করছে। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, ডার্কওয়েব থেকে চড়া দামে এনআইডির তথ্য কিনে অসাধু চক্র টেলিগ্রাম, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তা বিক্রি করছিল। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থামাতে ইসি ইতিমধ্যে বেশ কিছু অবৈধ ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বন্ধ করে দিয়েছে। এবার সরাসরি ডার্কওয়েবে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাতে ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশেষ মনিটরিং সফটওয়্যার ও টুলস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাজেট ও কারিগরি সরঞ্জাম বরাদ্দের বিস্তারিত চিত্র

এনআইডি ও পুরো আইসিটি বিভাগের সুরক্ষায় ইসি খাতভিত্তিক বাজেট অনুমোদন করেছে। আইসিটি সিস্টেম সাপোর্ট শাখার ডেটা সেন্টার রক্ষণাবেক্ষণে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্থাপনে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং অ্যান্টিভাইরাস, নেটওয়ার্ক ডিভাইস লাইসেন্সিং ও সহায়তায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এনআইডি উইংয়ের অধীনে ডার্কওয়েব সফটওয়্যারের ২ কোটি টাকা ছাড়াও সাইবার নিরাপত্তার পরীক্ষা বা ভিএপিটিতে (VAPT) ৩০ লাখ টাকা, নতুন ই-কেওয়াইসি (e-KYC) সফটওয়্যার ও এনআইডি মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে ১০ লাখ টাকা (প্রতিটিতে ৫ লাখ করে) এবং ক্লাউড এআই প্রযুক্তিতে ৩ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।

দেশে ডেটা ব্রিচ বা তথ্য ফাঁসের বাস্তব পরিসংখ্যান (২০২৩–২০২৬)

তথ্যপ্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) ‘Breached and Unanswered: Bangladesh’s Data Breach Epidemic (2023–2026)’ শীর্ষক এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশে ভয়াবহ তথ্য ফাঁসের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি বড় ধরনের তথ্য ফাঁসের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৬টি সরকারি এবং ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। ২০২৩ সালে ৭টি, ২০২৪ সালে ২৭টি এবং ২০২৫ সালে ১৪টি ডেটা ব্রিচ ঘটে। ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি-মে) ২০টি ঘটনা ঘটে, যার ১৩টিই সরকারি প্রতিষ্ঠানের। এই প্রতিবেদনে এনআইডি তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে, যেখানে উল্লেখ করা হয় নির্বাচন কমিশনের মূল এনআইডি ডেটাবেজে সরাসরি অনুপ্রবেশ না হলেও তৃতীয় পক্ষের (Third-party) যাচাইব্যবস্থা ও এপিআই (API) সংযোগে সুরক্ষার মারাত্মক ঘাটতি ছিল।

ইসি ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা সারাবাংলাকে বলেন, ডার্কওয়েবে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তথ্য ফাঁস ঠেকাতে সফটওয়্যার কেনার পাশাপাশি সমন্বিত আরও অনেক কারিগরি ও আইনি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ ইকবাল সারাবাংলাকে বলেন, বিশ্বজুড়ে ডার্কওয়েব মনিটরিংয়ের বহু কার্যকরী সফটওয়্যার আছে। তবে কেবল সফটওয়্যার কিনলেই কাজ হবে না; এটি চালানোর জন্য ২৪ ঘণ্টা দক্ষ জনবল রেখে নজরদারি চালাতে হবে। ইসির সেই দক্ষ জনবল আছে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

২৪/৭ ডেডিকেটেড সাইবার সিকিউরিটি টিম গঠন: শুধু কোটি টাকার ডার্কওয়েব মনিটরিং সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি কেনাই যথেষ্ট নয়; এটি চালনার জন্য ২৪ ঘণ্টা অভিজ্ঞ আইটি বিশেষজ্ঞ ও এথিক্যাল হ্যাকারদের সমন্বয়ে গঠিত টিম দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার ও এপিআই অডিট চালুকরণ: যেসব ব্যাংক বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইসির সার্ভারের সাথে যুক্ত (API connections), তাদের সিস্টেমে নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট ও কঠোর অ্যাকসেস কন্ট্রোল প্রয়োগ করতে হবে।

নিয়মিত পেনাল্ট্রেশন টেস্টিং (VAPT) ও ডেটা এনক্রিপশন: ইসির পুরো টেকনিক্যাল অবকাঠামোতে নিয়মিত বিরতিতে পেনাল্ট্রেশন টেস্টিং চালাতে হবে এবং এনআইডি ডেটা হস্তান্তরের সময় বিশ্বমানের এনক্রিপশন ব্যবহার করতে হবে যাতে মাঝপথে ডেটা ব্রিচ ঠেকানো যায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ‘ফ্যামিলি ট্রি’ গঠন এবং রেটিনা স্ক্যান ও বারকোড প্রযুক্তির প্রবর্তন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ডিজিটাল নাগরিক সেবা প্রদানে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। এসব উদ্যোগ যেমন একদিক থেকে এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের বহু বছরের দীর্ঘ ভোগান্তি, ভুল বানানের জটিলতা এবং আইনি হয়রানি স্থায়ীভাবে দূর করবে, তেমনি অন্যদিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা শতভাগ বৃদ্ধি করবে।