ঢাকা: আলেমদের শুধু মসজিদের মিম্বার কিংবা ইমামতির দায়িত্ব পালন করলেই হবে না, সমাজের নেতৃত্ব ও দায়িত্বও নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর আইডিইবি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিল ও মুফাসসির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যুগে যুগে জাতি যখন পথ হারিয়েছে, তখন উলামায়ে কেরাম তাদের পথ দেখিয়েছেন। আলেমদেরও সেই রাহবারের দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতিকে তিরস্কার না করে ভালোবাসা দিয়ে ইসলামের দিকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ইলমের চর্চা ও আমলের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে হবে।
আল্লাহর ওহির ওপর পরিবর্তন আনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেওয়ার এখতিয়ার কোনো মাখলুকের থাকতে পারে না। আল্লাহর ওহিতে পরিবর্তন আনা হলে মানুষ হেদায়েত ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।’
জাতীয় সংসদে কুরআন ও সুন্নাহবিরোধী বিল পাসের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের আইন প্রণয়ন, পরিমার্জন, পরিবর্তন ও কর্তনের কাজ করে। সংসদের বিভিন্ন বিষয় পাস করার অধিকার রয়েছে। তবে আল্লাহর ওহির ওপর হাত দেওয়ার এখতিয়ার কোনো মাখলুকের নেই।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ভালো নেই, দেশের মানুষও ভালো নেই।” শুধু খাওয়া-পরার সংকট নয়, ইজ্জত ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও মানুষ শঙ্কিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কে কখন কোথায় হারিয়ে যাবে কিংবা কাকে কখন অপমান করা হবে, তার কোনো ঠিকানা নেই। এ পরিস্থিতিতে আলেমদের সমাজের দায়িত্ব নিতে হবে।
আলেমদের নিজেদের চরিত্র, আমল ও আচরণের বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই-একজনের ভুলের কারণে পুরো আলেম সমাজের ভাবমর্যাদা যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পথভোলা মানুষকে মেহেরবানী, দরদ ও দায়িত্ব নিয়ে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। রেসালতের সত্যতা এবং আখিরাতের পরিণতির কথাও মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আলেমদের নবীজির এই আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নবী করিম (সা.) জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত দুনিয়ার শান্তি ভোগ করেননি। বরং আল্লাহর বান্দাদের শান্তির জন্য নিজের শান্তি বিসর্জন দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমস্ত সৃষ্টির রব এবং নবী (সা.) ছিলেন সকলের প্রতি দরদী। আলেমদেরও মানুষের প্রতি সেই দরদ ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের নবনির্বাচিত সভাপতি ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে এবং নবনিযুক্ত সেক্রেটারি মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীর পরিচালনায় সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল হালিম, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. খলিলুর রহমান মাদানী, কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সদস্য ড. মাওলানা ছামিউল হক ফারুকী, মুফাসসিরে কুরআন মুফতি ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, মাওলানা কেএম আবদুস সোবাহান, ড. বিএম মফিজুর রহমান আজহারী ও ড. ফয়জুল হক।
মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, অনেক ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের যাত্রা শুরু হয়েছে। মুফাসসিরদের বক্তব্যে উম্মাহর ঐক্য, দেশের সার্বভৌমত্ব ও হেদায়েতের পথে চলার নির্দেশনা থাকতে হবে। ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীকে আঘাত করে কথা না বলে সত্য ও সঠিক বিষয় হিকমাহ ও যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
ড. খলিলুর রহমান মাদানী বলেন, মুফাসসিররা বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষায় মাজলিসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশজুড়ে আলেমদের এই সংগঠন আগামীতে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এর আগে শনিবার সকাল ৯টায় আইডিইবি ভবনে বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীনের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। বিদায়ী সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাওলানা নুরুল আমিনকে সভাপতি, সাবেক ছাত্রনেতা ও মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা নাসির উদ্দিন হেলালীকে সেক্রেটারি এবং সাভারের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আযহারীকে সাংগঠনিক সেক্রেটারি করে ২৫ সদস্যের কার্যকরী পরিষদ ও ১০১ সদস্যের জাতীয় পরিষদ গঠন করা হয়।
কাউন্সিল ও সম্মেলনে সারাদেশ থেকে আসা পাঁচ শতাধিক মুফাসসির, বিভিন্ন মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, মুফতি, অধ্যক্ষসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আলেমরা উপস্থিত ছিলেন।