টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইল ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগী এবং স্বজনদের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি লিফটের পাঁচটি বিকল থাকায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে এই লিফট বিড়ম্বনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী ও তার স্বজনদের লিফটের জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন ফ্লোরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আর লিফট বিকলের বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণপূর্ত বিভাগের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের দায় সারছে।
২০১৪ সালে স্থাপিত টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবকাঠামো ও আধুনিক সুবিধার প্রত্যাশা থাকলেও হাসপাতালটির সেবা ব্যবস্থাপনায় মান নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। সেই সঙ্গে জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি, চিকিৎসক-স্টাফদের অনুপস্থিতি এবং লিফট বিকল থাকার মতো বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা যায়, প্রথম তালায় লিফটগুলোর সামনে রোগী ও তাদের স্বজনদের দীর্ঘ লাইন। তারা জানায়, ১৫ তলা হাসপাতালে বিভিন্ন ফ্লোরে যেতে লিফটের কোনো বিকল্প নেই। তাই তারা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে লিফটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন।
বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায়, গুরুতর অসুস্থ শম্ভুনাথ পাল লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে রয়েছেন। আর স্বজনরা তাকে খবরের কাগজ দিয়ে বাতাস করছে।
শম্ভুনাথের স্বজনরা জানায়, ডাক্তার দেখানোর পর নিচ তলায় নামতে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা। এমন সময় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বহুতল হাসপাতাল ভবনে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদের জন্য লিফট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য লিফটের বিকল্প নেই।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ ৭৪০ জন ডাক্তার, স্টাফ ও নার্সদের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন জনবল কর্মরত। ৫০০ শয্যার বিপরীতে হাসপাতালে ৮৪০ জন রোগী ভর্তি আছেন। অতিরিক্ত রোগী ও তার স্বজনদের সামলাতে অপ্রতুল জনবল নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ডাক্তার ও নার্সদের।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আনিসুর রহমান ও সালমা বেগম বলেন, ‘লিফটের জন্য ৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, ভিড় আর লম্বা লাইন থাকায় এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি।’ মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, ‘আজ আমার মার যদি গুরুতর কোনো কিছু হয় সেটা এই লিফটের কারণেই হবে।’ অপর এক অসুস্থ রোগী সকাল ১০টায় এসেছে লিফটে ভিড় ও লম্বা লাইন থাকায় সে দুপুর ২টায়ও ডাক্তার দেখাতে পারেনি।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুস সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাসপাতালের ১২টি লিফটের মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি লিফট বিকল রয়েছে। লিফট মেরামতের বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগকে বারবার চিঠি দেওয়া সত্ত্বেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের পুরো দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। ওটিজ ও ক্রিয়েটিভ এই দু’টি কোম্পানির মাধ্যমে লিফটগুলো সারাবছর রক্ষণাবেক্ষণ করিয়ে থাকে গণপূর্ত বিভাগ।’
তিনি আরও জানান, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমস্ত ক্রয় ইজিপি টেন্ডারের মাধ্যমে হয়, এখানে হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই। এ ছাড়া, হাসপাতালে ৭৪০ জন জনবলের বিপরীতে মাত্র ৩২২ জন থাকায় সমস্যা সমাধানে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে ।
লিফটের অভিযোগ প্রসঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভুরাম পাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি লিফট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি চালু আছে। বাকি পাঁচটি বিকল লিফট আমরা এখনো চালু করতে পারিনি। তবে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। বিকল লিফটগুলোতে অনেক দামি পার্টস প্রয়োজন, যা টাঙ্গাইলে পাওয়া যায় না। ঢাকা থেকে আনতে হয়।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে লিফট কোম্পানিকে এরই মধ্যে অবহিত করা হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ধরা আছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। এই টাকা ১২টি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। সেজন্য এ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।