প্রযুক্তি শব্দটি আজ আমাদের জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। আধুনিক সভ্যতার প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির উপস্থিতি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সুতরাং এর ক্ষতিকর আসক্তি দূর করে এর ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আজকের ডিজিটাল যুগে সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়, বরং তাকে প্রযুক্তির আসক্তি থেকে বের করে এনে সঠিক ব্যবহার শেখানোই মূল সমাধান। তাই এই প্রযুক্তিকে আমাদের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম হিসেবে নয়। সন্তানকে প্রযুক্তির দুনিয়া থেকে দূরে না ঠেলে, কীভাবে তার আসক্তি দূর করা যায় সেই ব্যবস্থাই গ্রহণ করতে হবে।
প্রযুক্তি মানুষের দাস, মানুষ প্রযুক্তির দাস নয়—এই গুরুত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়েই আমাদের এগিয়ে চলা উচিত। অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতার কারণে কিশোরদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং এই আসক্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকাল অনেক কিশোর মোবাইল ফোনের প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মোবাইল ব্যবহারের পাশাপাশি অনলাইন গেম, টিকটক রিলসসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল বিনোদনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছে। ফলে মোবাইল তাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিশোর বয়স মানুষের জীবনের এমন একটি সংবেদনশীল সময়, যখন নতুন কিছু জানার আগ্রহ, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা ও অন্যকে অনুসরণ করার মানসিকতা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই এ বয়সে মোবাইলের সঠিক ব্যবহার যেমন তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে পারে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে নয় বরং তাকে আসক্তি থেকে বের করে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কিশোরদের দৈনন্দিন খেলাধুলা, শরীরচর্চা, বইপড়া, ঘরের কাজ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা, সৃজনশীল কাজে উত্সাহ প্রদান, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বেড়ানো ও বিনোদনের ব্যবস্থা করাসহ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। কারণ প্রযুক্তি এখন আর শিশুর জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বিষয় নয়। পড়াশোনা, যোগাযোগ, বিনোদন-সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি দরকার। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত টেকনোলজি-ফ্রি চাইল্ড নয়, টেকনোলজি-রেসপন্সিবল চাইল্ড তৈরি করা।
প্রযুক্তিতে দক্ষতার ক্ষেত্রে মানুষকে তার ব্যবহৃত ডিভাইস দিয়ে মূল্যায়ন না করে বরং প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারে মানুষটি কতটুকু দক্ষ সেটা মূল্যায়ন করা উচিত। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সন্তানদের এই শিক্ষা যত আগে দেওয়া যায়, ততই ভালো এবং উত্তম। বর্তমান প্রযুক্তিগত আধুনিকতার নামে, সুবিধার মোড়কে মোড়ানো এই প্রযুক্তি যদি আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক সম্পর্ক ও সৃজনশীল চিন্তাকে ক্ষয় করতে থাকে, তবে সেই আধুনিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এখন এসেছে। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা সমাধান নয়; বরং প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার, নৈতিকতা ও ভারসাম্য। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে প্রযুক্তি আমাদের দাস —প্রভু নয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি আমাদের দাসত্ব করবে আর আমরা প্রযুক্তির উপর রাজত্ব করব। কেননা প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে মানুষের জীবনকে সহজ, গতিশীল এবং আরামদায়ক করার জন্য। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করেই এর সৃষ্টি। তাই প্রযুক্তির অবস্থান সবসময় মানুষের নিচে এবং প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। প্রযুক্তি আমাদের পরিচালনা করবে না, বরং আমরা প্রযুক্তিকে আমাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করব। প্রযুক্তির দাসত্ব নয়, বরং প্রযুক্তিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে এর সঠিক ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হলো প্রযুক্তির উপর রাজত্ব করা। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে আজকের সন্তানেরা এবং তরুণ সমাজ চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে, তেমনি এর অনিয়ন্ত্রিত ও নেতিবাচক ব্যবহার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক বিকাশে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনছে। এই বিপর্যয় থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারিবারিক সচেতনতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমরা কিছুতেই তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করতে পারব না। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা এগিয়ে যাব, তবে এর সঠিক ব্যবহার করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মুঠোফোন, ট্যাবলয়েড ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, কম্পিউটার ব্যবহার সম্পর্কে খারাপ ও ভালো দিকগুলো অবহিত করতে হবে। আবার বিনোদনের জন্যও তাদের কিছুটা সময় দিতে হবে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে শিশু যেন ভ্রান্তপথে না যায়। প্রযুক্তির অপব্যবহার সত্যিই আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য একটি চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও, এর অনিয়ন্ত্রিত এবং নেতিবাচক ব্যবহার কোমলমতি শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। স্মার্টফোন নিঃসন্দেহে আধুনিক জীবনের এক অপরিহার্য অংশ। কিন্তু শিশুদের জন্য এটি যেন হয়ে উঠেছে এক নীরব বিপদ। যে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ, দ্রুত ও সংযুক্ত করেছে, সেই প্রযুক্তিই নিঃশব্দে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিচ্ছিন্ন, নির্ভরশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এক বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই শিশুদের হাতে শুধু ডিভাইস নয়, দিতে হবে সময়, সান্নিধ্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। কারণ একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে সুস্থ শৈশবের ভিত্তির ওপর।
লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়