সিঙ্গাপুরে ডিজেলের দাম ৩৭৫ টাকা, বাংলাদেশে ১৩৫ টাকা। এই হিসাবটা সামনে এনে অনেকেই এমনভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করছেন, যেন পৃথিবীর সব দেশের মানুষের আয়, জীবনযাত্রা, ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক। যেন শুধু পণ্যের দামটাই তুলনা করলেই অর্থনীতির পুরো চিত্র বোঝা যায়।
এখানেই আসল ভুলটা। সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় যদি প্রায় ৯২ লাখ টাকা হয় আর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় যদি সাড়ে ৩ লাখ টাকার মতো হয়, তাহলে শুধু ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম পাশাপাশি বসিয়ে ‘ওদের এত, আমাদের এত’ বলা কোনো অর্থবহ তুলনা নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন মানুষের আয় থেকে এক লিটার জ্বালানি কিনতে তার কতটুকু অর্থ ব্যয় হচ্ছে? সেই জ্বালানি কেনার পর তার হাতে কত টাকা থাকছে? বাসা ভাড়া, খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, পানি, পোশাকসহ প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর তার ক্রয়ক্ষমতা কতটুকু থাকছে?
অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ক্রয়ক্ষমতা। পণ্যের দাম একা কোনো মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে না। দামকে আয় ও ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
ধরুন, কারও মাসিক আয় ১০ লাখ টাকা। সেখানে একটি পণ্যের দাম ৫০০ টাকা হলে সেটি তার আয়ের তুলনায় কতটা চাপ তৈরি করছে? আবার কারও মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা, একই পণ্যের দাম যদি ১০০ টাকা হয়, তাহলে সংখ্যাটা ছোট হলেও তার আয়ের ওপর চাপ হয়তো অনেক বেশি। কাগজে-কলমে দ্বিতীয় পণ্যের দাম কম, কিন্তু মানুষের জীবনে সেটিই হতে পারে বেশি ব্যয়বহুল।
এ কারণেই সিঙ্গাপুরের ডিজেলের দাম ৩৭৫ টাকা আর বাংলাদেশের ১৩৫ টাকা, এই দুটি সংখ্যা পাশাপাশি বসিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে বোঝানো যে ‘দেখো, ওরা বেশি দামে কিনছে, তোমরাও পারবে’, এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অর্ধেক দেখানো।
সিঙ্গাপুরের মানুষ ৫০০ টাকা দামে কোনো জ্বালানি কিনলেও হয়তো তার আয়, সঞ্চয়, সামাজিক নিরাপত্তা, নগর অবকাঠামো, গণপরিবহন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য সূচক সেই দাম বহনের সক্ষমতা তৈরি করে। বাংলাদেশে একজন সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই একই দামের বোঝা দুই দেশের মানুষের ওপর একইভাবে পড়ে না।
আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। মাথাপিছু আয় মানেই প্রত্যেক নাগরিকের পকেটে সেই পরিমাণ টাকা আছে, এমন নয়। মাথাপিছু আয় একটি গড় হিসাব। দেশের মোট আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, সেটিই মাথাপিছু আয়। কিন্তু বাস্তব সমাজে আয় সমানভাবে বণ্টিত হয় না। কারও আয় অনেক বেশি, কারও আয় খুব কম, আবার কেউ হয়তো নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তাই পান না। ফলে মাথাপিছু আয় দিয়ে একজন সাধারণ মানুষের প্রকৃত জীবনযাত্রা বোঝার জন্য আরও অনেক বিষয় দেখতে হয়।
পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এই জায়গাটাই সবচেয়ে বেশি বোঝা দরকার। একটি দেশের জাতীয় আয় বাড়তে পারে, মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাজার কোটি টাকার লেনদেন করতে পারে, কিন্তু সেই অর্থনীতির সুবিধা সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনে সমানভাবে পৌঁছায় না। তাই মাথাপিছু আয়ের সংখ্যা দেখে উচ্ছ্বসিত হওয়ার আগে প্রশ্ন করতে হবে, এই আয় কার হাতে যাচ্ছে, মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আয়ের তুলনায় কতটা চাপ তৈরি করছে।
জ্বালানির দাম নিয়ে আলোচনা করতে গেলেও একই হিসাব প্রযোজ্য। ডিজেলের দাম শুধু গাড়ির মালিকের ওপর প্রভাব ফেলে না। ডিজেল দিয়ে ট্রাক চলে, বাস চলে, সেচের পাম্প চলে, নৌযান চলে, পণ্য পরিবহন হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, কৃষির উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে, বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটা অংশ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার পকেটে।
তাই প্রশ্নটা শুধু ‘এক লিটার ডিজেল কত টাকা’ নয়। প্রশ্ন হলো, সেই এক লিটার ডিজেলের দাম একজন শ্রমিকের এক ঘণ্টার আয়ের কত অংশ? একজন কৃষকের উৎপাদন খরচে এর প্রভাব কতটা? একজন পরিবহন শ্রমিকের দৈনিক আয় থেকে জ্বালানির ব্যয় বাদ দিলে হাতে কত থাকে? একজন নিম্নআয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বাজারদরের এই পরিবর্তন কতটা চাপ তৈরি করে?
এই প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে শুধু সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিজেলের দাম তুলনা করা অনেকটা একজন ধনী মানুষের খাবারের বিল দেখিয়ে একজন দিনমজুরকে বলা, ‘দেখো, সে এত টাকা খরচ করে খায়, তুমিও পারবে।’ দাম তুলনা করা যাবে। অবশ্যই যাবে। কিন্তু তুলনার সঙ্গে আয়, ক্রয়ক্ষমতা, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, করব্যবস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং মানুষের বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থাও তুলনা করতে হবে। না হলে সেটি তথ্যের ব্যবহার নয়, তথ্যের অপব্যবহার হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় বিদেশের দাম দেখিয়ে দেশের মানুষকে বেশি দাম মেনে নেওয়ার উপদেশ দিই, কিন্তু বিদেশের আয়, মজুরি, নাগরিক সুবিধা, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে একইভাবে তুলনা করি না। দামের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক তুলনা, কিন্তু আয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা। সুবিধার জায়গায় শুধু এক পক্ষের হিসাব। এভাবে তো অর্থনীতির বিচার হয় না। কারও সঙ্গে তুলনা করতে হলে পুরো ছবিটা তুলনা করুন।
সিঙ্গাপুরের ডিজেল কত টাকা, সেটার পাশাপাশি একজন সিঙ্গাপুরবাসী গড়ে কত আয় করেন, তার প্রয়োজনীয় খরচ কত, পরিবহনে কত ব্যয় করেন, কর কত দেন, কী ধরনের নাগরিক সুবিধা পান, তার ক্রয়ক্ষমতা কেমন, এসবও দেখুন। একইভাবে বাংলাদেশের একজন মানুষের আয়, ব্যয়, বাজারদর, মজুরি, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার বাস্তবতাও দেখুন। তখন হয়তো বুঝবেন, ৩৭৫ টাকা আর ১৩৫ টাকার ব্যবধানটাই পুরো গল্প নয়। অর্থনীতিতে শুধু দাম দেখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, দামের পেছনে মানুষের সামর্থ্যটাও দেখতে হয়।
আর একটা কথা মনে রাখা দরকার। কোনো দেশে কোনো পণ্যের দাম কম মানেই সেই দেশের মানুষ সুখে আছে না, আবার কোনো দেশে দাম বেশি মানেই সেখানকার মানুষ দুর্ভোগে আছে, সেটাও নয়। আসল প্রশ্ন হলো, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় সেই দাম কতটা সহনীয়। তাই অন্য দেশের বাজারদর দেখে নিজের দেশের মানুষকে জ্ঞান দেওয়ার আগে একটু হিসাব করুন। যে দেশের মানুষের আয়, জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কাঠামো আলাদা, সেই দেশের একটি পণ্যের দাম কপি করে এনে নিজের দেশের মানুষের ওপর একই যুক্তি চাপিয়ে দেওয়া অর্থনীতির বিশ্লেষণ নয়। বরং নিজের দেশের মানুষের পকেটের দিকে তাকান। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোনো পরিসংখ্যানের পাতায় আটকে থাকে না। তার সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষা হয় বাজারে, বাসভাড়ায়, কৃষকের সেচের খরচে, ট্রাকের ভাড়ায়, মুদি দোকানের হিসাবের খাতায় এবং মাসের শেষে একজন সাধারণ মানুষের খালি পকেটে।
অন্য দেশের ডিজেলের দাম কত, সেটা জানার আগে নিজের দেশের মানুষের এক লিটার ডিজেল কিনতে কতটা ঘাম ঝরাতে হয়, সেই হিসাবটা বুঝুন। তুলনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন শুধু দাম নয়, মানুষের সামর্থ্যটাও পাশাপাশি রাখা হবে।
লেখক: কলামিস্ট, গণমাধ্যমকর্মী ও সংগঠক