Tuesday 06 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

সুন্দরবনে বাঘের পায়ের ছাপের স্মৃতি এখনও মনে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৩৬

‘শিশু অধিকার দিবস-২০২৬’- এর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: শৈশবে বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সুন্দরবন ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে একটি পুকুরের পাড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের তাজা পায়ের ছাপ দেখার স্মৃতি এখনও তার মনে আছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিশুদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শৈশবের সবচেয়ে মজার বা প্রিয় স্মৃতি জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শৈশবের মজার স্মৃতি বলতে গেলে—আমার বাবা তো খুব ব্যস্ত থাকতেন। আমরা, আমি ও আমার ছোট ভাই, খুব একটা তাদের সঙ্গে বাইরে বের হতে পারতাম তা না। আমরা স্কুল নিয়ে, স্কুলের হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘তবে একবার আমার আব্বা আমার আম্মাকে, আমাকে এবং আমার ছোট ভাইকে নিয়ে সুন্দরবনে গিয়েছিলেন। আমরা তিন দিন সেখানে ছিলাম। সুন্দরবনের ওই স্মৃতিটা আমার খুব মনে পড়ে।’

স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওখানে আমরা একবার নামলাম—হিরণ পয়েন্ট একটা জায়গা আছে, আইল্যান্ডের মতো, ছোট দ্বীপের মতো। ওখানে নামলাম। সেখানে একটা পুকুর ছিল। পুকুরটার পাড়ে যখন আমরা গেলাম, তখন স্থানীয় একজন দেখালেন—পুকুরের পাড়ে আগের দিন রাতে বাঘ এসেছিল। রয়েল বেঙ্গল টাইগার পানি খেতে এসেছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পুকুর পাড়ে কাদা কাদা ছিল। সেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একদম ফ্রেশ থাবার ছাপ ছিল। ওই স্মৃতিটা এখনও মনে পড়ে।’

বড় হয়ে কী হতে চেয়েছিলেন

ছোটবেলায় বড় হয়ে কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?—এক শিশুর এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সত্যি কথা বলব, আসলে তখন কোনো স্বপ্ন দেখতাম না। তোমার মতো যখন ছোট ছিলাম, তখন শুধু ভাবতাম যে বড় হয়ে সব খেলনা কিনে নেব। যখন বড় হব, তখন সব খেলনা কিনে নেব—এরকমই ভাবতাম।’

শুধু পড়ালেখা নয়, প্রতিভা বিকাশের সুযোগ

শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ও সুশিক্ষা নিশ্চিতে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুরা যত সুন্দর ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বড় হবে, বাংলাদেশও তত আত্মবিশ্বাসী দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।

তিনি বলেন, ‘শুধু লেখাপড়া করলে হবে না। লেখাপড়ার পাশাপাশি তোমাদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিভা আছে। কেউ গান ভালো করে, কেউ মিউজিক করতে পারে, কেউ নাচতে পারে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করতে পারে, কেউ কোরআন তেলাওয়াত ও কেরাত প্রতিযোগিতায় ভালো, কেউ খেলাধুলায় ভালো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক শিশুকে তার প্রতিভা বিকাশের জন্য যতটা সম্ভব সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।’ শিশুদের আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ

ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পড়াশোনা, বিজ্ঞান মেলা, খেলাধুলা কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো বিষয়ে জানার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।’ তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় না করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমরা নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাদ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক সময় ব্যয় করি। আমি মনে করি, এটা ঠিক না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় আধা ঘণ্টার জন্য একবার ব্রাউজ করে দেখবে কে কী বলল। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া বা এই ধরনের বিষয়ে এত লম্বা সময় না থেকে বরং তোমার জন্য যেটা গুরুত্বপূর্ণ, প্রযুক্তি যে কাজে তোমাকে সাহায্য করবে—পড়ালেখা হোক বা অন্য কোনো বিষয়—সেগুলোতে বেশি সময় দেওয়া উচিত।’

শিশুদের প্রশ্নে ‘বড়রা শিখিয়ে দিয়েছে’ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য

শিশুদের প্রশ্নের ধরন দেখে প্রধানমন্ত্রী এক পর্যায়ে বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় প্রশ্নগুলো বড়রা শিখিয়ে দিয়েছে। তোমাদের নিজেদের কিছু থাকলে জিজ্ঞেস করো? যেটা মনের মধ্যে আছে সেটা জিজ্ঞেস করো।’

এরপর এক শিশু জানতে চায়, প্রধানমন্ত্রী কোন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি দুইটা স্কুলে পড়ালেখা করেছি। একটা শাহীন স্কুলে, ল্যাবরেটরি স্কুলেও ছিলাম।’

প্রতি ইউনিয়ন-উপজেলায় খেলার মাঠের পরিকল্পনা

খেলাধুলায় আগ্রহী শিশুদের জন্য প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ বা ইনডোর স্টেডিয়াম তৈরির পরিকল্পনা আছে কি না? জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব জায়গায় স্টেডিয়াম করা সম্ভব না হলেও উন্মুক্ত মাঠ বা খেলার জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে সরকার।’

তিনি বলেন, ‘স্টেডিয়াম একটু কস্টলি ব্যাপার। আমাদের মতো দেশের জন্য সব জায়গায় স্টেডিয়াম করা সম্ভব না। তবে আমরা ওপেন মাঠ—প্রত্যেকটা ইউনিয়নে বা উপজেলায়—চেষ্টা করছি বাচ্চারা যাতে খেলতে পারে, তার জন্য একটা ওপেন স্পেস তৈরি করার।’

এই জায়গায় শিশুরা খেলাধুলার পাশাপাশি অভিভাবকরাও বিকেলে হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ে শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ে শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের আগ্রহ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্ট প্রতিযোগিতা, কোরআন কেরাত, ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিশুরা ভালো করছে। ভবিষ্যতে শিশুদের উৎসাহ বাড়াতে আরও সুযোগ তৈরি করা হবে।’

‘স্পোর্টস বলো, সায়েন্স ফেয়ার বলো, কুইজ কম্পিটিশন বলো, ম্যাথস কম্পিটিশন বলো—তোমাদের মতো বাচ্চারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাবে, তাদের সব রকম সহযোগিতা করে যাতে তারা সুন্দর ভালো রেজাল্ট নিয়ে আসতে পারে’— বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা

পথশিশু ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে এক শিশুর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের অনেক শিশু ন্যূনতম শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক লক্ষ লক্ষ শিশু—তুমি যেরকম বললা—তারা মিনিমাম এডুকেশন থেকে বা মিনিমাম বাচ্চাদের যে ফ্যাসিলিটি, সেগুলো থেকে ডিপ্রাইভ।’

এসব শিশুর কাছেও ধীরে ধীরে শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হয়তো সময় লাগবে। কিন্তু ইনশাল্লাহ আমরা পারব।’

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা

শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার শিশুদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের শিশুদের জন্য দেশে কিছু সুবিধা থাকলেও তা খুবই সীমিত। সরকার এসব সুবিধা সম্প্রসারণ করতে চায়। তাদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল, প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও প্রশিক্ষক তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে নেওয়া হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই ধরনের বাচ্চা যারা আছে, তাদের যেরকম ইনস্ট্রাকচার বা টিচার যাদের প্রয়োজন হয়, সেরকম এনাফ টিচার বা ইনস্ট্রাক্টরও নেই আমাদের। কাজেই ওই টিচারদের তৈরি করা, ইনস্ট্রাক্টরদের তৈরি করা। তারপরে সেই ফ্যাসিলিটিগুলো তৈরি করা—এটা একটু সময় লাগবে। বাট আমরা কাজে হাত দিয়েছি।’

শিশুদের মতামতও নেন প্রধানমন্ত্রী

দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের মতামত জানতে চান কি না?—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার মেয়ে জাইমা রহমানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমার একটা মেয়ে আছে— ও বড় হয়ে গেছে এখন। তবে মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে আমি আলাপ করি। ও যেহেতু বড় হলেও আমার থেকে তো অনেক ছোট। তোমাদের থেকে হয়তো একটু বড়। আমার সঙ্গে তোমাদের গ্যাপ যেহেতু বেশি, সেজন্য তোমাদের মাইন্ডটা ও রিড করতে পারে।’

শিশুদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জাইমার সঙ্গে আলোচনা করে তার কাছ থেকে ধারণা নেওয়া হয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’

শিশুদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।’ তিনি বলেন, ‘তুমি যখন টিভিতে বাইরের কোনো সুন্দর একটা দেশ দেখো, নিশ্চয়ই চিন্তা কর যে, বাংলাদেশটা যদি এরকম হতো। অন্য কোনো দেশের ছবি দেখলে বা ভিডিও দেখলে চিন্তা করো—আমার দেশটাও যদি ওই দেশের মতো হতো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই ওই দেশের মতো করা সম্ভব। কিন্তু সেটা যদি তোমরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নাও যে, হ্যাঁ, আমাদের বাংলাদেশটাকে আমরা ওরকম সুন্দর করে গড়ে তুলব, তাহলে সম্ভব।’

তিনি শিশুদের নিজেদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তোমরা যদি নিজেদেরকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পার, তাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশটাকে আমরা সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারব।’

অনুষ্ঠানে শিশুদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকে কাজ করার অনুভূতি জানতে চাওয়া এক শিশুর প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘তোমরা এতজন মিলে প্রশ্ন করছো না—ডেঞ্জারাস ব্যাপার এখান থেকে কাজ করা। খুব কঠিন।’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, দিনাজপুর, খাগড়াছড়ি, খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার শিশুরা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন করে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও শিশু অধিকার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। পরে শিশুদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর