হাজারো ব্যস্ততা আর হিসাব-নিকাশের এই যান্ত্রিক জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই মনটা বড় বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। দুশ্চিন্তা, অজানা ভয় কিংবা না-বলা মানসিক চাপ কেড়ে নেয় মনের স্বাভাবিক স্বস্তি। তবে ইসলাম ধর্মে মানুষের এই মানসিক কষ্টগুলোকে কখনই তুচ্ছ করা হয়নি; বরং কঠিন ও ভারাক্রান্ত সময়ে মুমিনকে আরও বেশি আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে, পরম করুণাময়ের দরবারে দুহাত তুলে দোয়া করতে এবং তার স্মরণে অন্তরকে প্রশান্ত করতে শেখানো হয়েছে।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা পরম মমতায় ইরশাদ করেছেন—
‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রাদ: ২৮)
মন খারাপ, দুশ্চিন্তা কিংবা উৎকণ্ঠার মুহূর্তে কোরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত বরকতময় কয়েকটি দোয়া পাঠ করা যেতে পারে:
দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে মুক্তির দোয়া
প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) দুশ্চিন্তা, দুঃখ এবং জীবনের নানা চাপ থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত এই বিশেষ দোয়াটি পাঠ করতেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি প্রায়ই দোয়া করতেন—
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া দালাইদ-দাইনি, ওয়া গালাবাতির রিজাল।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে, ঋণের ভার এবং মানুষের কাছে পরাভূত হওয়া থেকে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩৬৯)
এই ছোট্ট দোয়ায় শুধু দুশ্চিন্তা বা দুঃখই নয়, বরং মানুষের জীবনের প্রতিটি দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে।
হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়া
বিপদের গভীর অন্ধকারে বা চরম মানসিক সংকটে পড়ার পর মহান আল্লাহর সাহায্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো ইউনুস (আ.)-এর দোয়া। মাছের পেটে অন্ধকার কুঠুরিতে বসে তিনি এই পবিত্র বাক্যটি উচ্চারণ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও মুক্তি প্রার্থনা করেছিলেন—
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ: ‘আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’
এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছি এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করেছি। আর এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি।’ (সুরা আম্বিয়া: ৮৭-৮৮)
এই দোয়ার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি কোনো বিপদের সময় এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করেন। (জামে তিরমিজি: ৩৫০৫)
কষ্টের বিপরীতে স্বস্তির সুসংবাদ
মন খারাপের মেঘ জমে থাকলে দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহর অমোঘ বাণীর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা জরুরি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আশ্বস্ত করেছেন—
‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে।’ (সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬)
এই আয়াতটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের যেকোনো অন্ধকার মুহূর্তেই আল্লাহর রহমত ও শেষের সুদিনের আশা কখনোই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
আল্লাহর স্মরণে অন্তরের প্রশান্তি
মন ভালো করার জন্য ইসলামে কেবল একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। আল্লাহর জিকির, সালাত আদায়, কুরআন তিলাওয়াত এবং একান্তে তার কাছে নিজের মনের আকুতি তুলে ধরা হলো প্রকৃত প্রশান্তির চাবিকাঠি। তাই মন ভার হয়ে এলে সিজদায় গিয়ে কিংবা নিরিবিলিতে চোখের পানি ফেলে নিজের কষ্টের কথা আল্লাহর কাছে খুলে বলুন; ইনশাআল্লাহ মন হালকা হয়ে যাবে।
দোয়ার পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ
ইসলামে দোয়া ও তাওয়াক্কুলের (ভরসা) পাশাপাশি জীবনের বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি মনে রাখবেন, মন খারাপ যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, দৈনন্দিন কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে গুরুতর পরিবর্তন আসে কিংবা নিজের কোনো বড় ক্ষতির চিন্তা মনের মধ্যে উঁকি দেয়, তবে বিশ্বস্ত কোনো মানুষের সাথে মনের কথা শেয়ার করার পাশাপাশি একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের (Therapist/Counselor) পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরি।
হতাশা বা বিষণ্ণতা যখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে, তখন ভেঙে না পড়ে পরম আশ্রয়ের ঠিকানায় ফিরে আসুন। জীবনের প্রতিটি চড়াই-উতরাই ও ভারাক্রান্ত সময়ে মুমিনের একমাত্র ভরসা ও সবচেয়ে বড় প্রশান্তির চাবিকাঠি হলো মহান আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস এবং তার কাছে হাত পাতার অভ্যাস।