Monday 12 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

অগ্রণী ব্যাংকে ৭০০ কর্মী নিয়োগে বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ!

আদিল খান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১২ অক্টোবর ২০২৬ ২১:৩১

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি। ফাইল ছবি

ঢাকা: দৈনিক মজুরিভিত্তিক ৬৯৮ কর্মচারীকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিয়ে স্থায়ী করার উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বয়সসীমা, স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিতের বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, প্রস্তাবিত নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও সরকারি বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

ব্যাংকটির নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীকে সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ জন্য চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধন এবং নিয়োগের শর্ত নির্ধারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের দাবি, এটি নতুন নিয়োগ নয়; আগে থেকে কর্মরত কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ী করার উদ্যোগ।

বিজ্ঞাপন

অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, নিয়োগের সময় লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া না হলে এবং পরে তাদের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের নীতি প্রশ্নের মুখে পড়বে। এতে সরকারি ব্যাংকে চাকরিপ্রত্যাশী অন্য প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাদের আশঙ্কা, বিপুলসংখ্যক কর্মচারীকে কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিলে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে।

অগ্রণী ব্যাংকের মানবসম্পদ পরিকল্পনা বিভাগের ১২৯১ নম্বর স্মারক অনুযায়ী, ‘অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-২০০৮’ হালনাগাদ করে ‘অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি. (কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৫’-এর খসড়া তৈরির জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত ১২ এপ্রিল থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট সাতটি সভা করে।

নথিপত্রে দেখা যায়, প্রস্তাবিত প্রবিধানমালার খসড়া তফসিল-২-এর ২৯ নম্বর ক্রমিকে সহকারী কর্মকর্তা পদে সরাসরি নিয়োগের শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত ১৯ আগস্ট ব্যাংকটির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ১ হাজার ২৮তম সভায় সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছরের শর্ত শিথিল করার সিদ্ধান্ত হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণসংক্রান্ত আইনের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের বক্তব্য, আগে থেকে কর্মরত কর্মচারীদের নিয়োগ স্থায়ী করার ক্ষেত্রে বয়সসীমা বাধা হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিআরপিডি-১ সার্কুলার নম্বর ১৮/২০২৬-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতা আবশ্যক নয়, সেসব এন্ট্রি পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও আবেদনের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যাংকের ওয়েবসাইট এবং অন্তত দু’টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। এ ছাড়া এ ধরনের পদে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিক বা লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অগ্রণী ব্যাংকের প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় সহকারী কর্মকর্তা (গ্রেড-১১) পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে পরীক্ষার পদ্ধতি ও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ফলে এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০১০ সালে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের যোগ্যতা যাচাই না করে কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের নিয়োগব্যবস্থায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

অগ্রণী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৪০ শতাংশের বেশি এবং প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এমন আর্থিক পরিস্থিতিতে একসঙ্গে প্রায় ৭০০ কর্মচারীকে সহকারী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিলে ব্যাংকের ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাদের প্রশ্ন, এতসংখ্যক কর্মচারীকে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের দায়িত্ব, পদায়ন ও বসার জায়গা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এ নিয়োগের ফলে ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।

কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ, নিয়োগের সময় পরীক্ষা ও বিজ্ঞপ্তি না থাকলে পরবর্তী সময়ে তাদের স্থায়ী বা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া মেধাভিত্তিক নিয়োগনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে কাজ করছেন এবং তাদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়টি নতুন নিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১০ সালে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে ৬৯৮ জন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বয়স শিথিল করা হয়েছে। তা মানলে তো নিয়োগ দেওয়া যাবে না। সবকিছু পরিষ্কার করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আশা করি, ৩২ বছর বয়সের শর্ত বাধা হবে না। তাদের পদবিও বাধা হবে না। কেননা, আমরা তো নতুন কাউকে নিয়োগ দিচ্ছি না। তারা আগে থেকেই ব্যাংকের কাজে জড়িত। মূলত যারা আছেন, তারাই স্থায়ী নিয়োগ পাচ্ছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী এ নিয়োগ স্থায়ী করা হবে।’

অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরিপ্রাপ্ত কর্মচারীদের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাহীন আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আর নতুন করে টাকা দেব না। আগেই দিতে দিতে শেষ। এখনো আমাদের কাছে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুস দেওয়ার সুযোগ নেই। আর এ মাসে নিয়োগ স্থায়ী হবে, আশা করা যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকে প্রায় ১৫০ জন চালকও রয়েছেন। তাদের নিয়োগের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।’

বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার কর্তৃক গঠিত বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বক্তব্য নেই। বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত। তারা আইন বা বিধির ব্যাখ্যা দিতে পারবে।’

সারাবাংলা/এসএ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর