Saturday 24 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের বাঁকে মরণফাঁদ, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল

রেজাউল ইসলাম তুরান
২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২১:০২ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২১:৫৮

খুলনা: খুলনা-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, সড়কের বেহাল অবস্থা, খানাখন্দ এবং অবৈধ ও অননুমোদিত যানবাহনের চলাচল—সব মিলিয়ে মহাসড়কটি যেন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করা ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা-চালক ও যাত্রীরা।

গত ২১ অক্টোবর রাতে মাছের ব্যবসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার নরনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রউফ গাজী (৪৩) ও তার কর্মচারী ইউনুস। পেশায় মৎস্য আড়তদার রউফ ওই দিন কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে মাছচাষিদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে চুকনগর বাজারে যান। কাজ শেষে রাত দেড়টার দিকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে আঠারমাইল বাসস্ট্যান্ডের কাছে ঢাকা থেকে সাতক্ষীরাগামী একটি বাস তাদের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। এতে দুজন সড়কে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান।

বিজ্ঞাপন

এর পরদিন, ২২ অক্টোবর, একই মহাসড়কের আঠারমাইল এলাকায় ট্রাক ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন জিন্নাত মিয়া (৩৫) ও রফিউর রহমান রউফ (২৬) নামের দুই যুবক। পরপর এসব দুর্ঘটনা মহাসড়কটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে বেড়েছে উদ্বেগ

খুলনা হাইওয়ে পুলিশের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে ১০৮টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৭৩ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২৫ সালে এ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩ জন।

এ বছরও ঘটেছে প্রাণঘাতী একাধিক দুর্ঘটনা। গত ৩ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া এলাকায় বেপরোয়া গতির একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। এতে সাইদুর রহমান সাইদ (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। এর আগে গত ৪ জুলাই খুলনা-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়কের খর্ণিয়া সেতুসংলগ্ন এলাকায় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান শামছুজ্জামান (৪০) নামের এক যুবক।

৬৪ কিলোমিটার সড়কে ১০৯ বাঁক

সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কটি অত্যন্ত ব্যস্ত একটি আঞ্চলিক সড়ক। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৪ কিলোমিটার। সড়কটির বড় একটি অংশ পড়েছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মধ্যে। পুরো সড়কে রয়েছে ১০৯টি বাঁক। প্রতিদিন বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের হাজারো যানবাহন চলাচল করে এ পথে।

খুলনার জিরো পয়েন্ট থেকে কৈয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক তুলনামূলকভাবে সোজা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ অংশে বড় দুর্ঘটনা তুলনামূলক কম ঘটে। তবে কৈয়া বাজার পেরোলেই একের পর এক বাঁক। এর মধ্যে জিলেরডাঙ্গা ও গুটুদিয়া এলাকার বাঁক দুটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া বালিয়াখালী সেতুর আগে এবং কাঁঠালতলা এলাকাতেও রয়েছে বিপজ্জনক বাঁক।

বাঁকের পাশাপাশি সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, এ মহাসড়কে নসিমন, করিমন ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যানসহ বিভিন্ন অননুমোদিত যানবাহন চলাচল করায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

ডুমুরিয়া উপজেলার আঠারো মাইল এলাকার বাসিন্দা সাইমুন ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। সড়কটিতে অনেকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। যে কারণে প্রতিনিয়ত এই সড়কটিতে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। এই সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?’

মহাসড়কটিতে চলাচলকারী বাসচালক আবু তাহের বলেন, ‘বর্তমানে সড়কটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সড়কটির বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া সড়কজুড়ে অবৈধ ইজিবাইক ও সিএনজির দাপট। যে কারণে সড়কটিতে দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।’

একই সড়কে চলাচলকারী ইজিবাইকচালক রহিম শেখ বলেন, ‘সড়কটির অবস্থা খুব খারাপ। ওই রোড দিয়ে সুস্থ যাত্রীর অবস্থাই ভালো থাকে না, অসুস্থ হলে আরও বিপাকে পড়তে হয়। যে কারণে কোনো ইজিবাইকচালক সহজে যেতে চায় না।’

সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা আফজাল হোসেন চাকরির সুবাদে খুলনায় থাকেন। তাকে নিয়মিত বাড়িতে যাতায়াত করতে হয় এই মহাসড়ক দিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি খুলনাতে চাকরির সুবাদে বসবাস করি। আমার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। যে কারণে প্রায়ই আমার বাড়িতে বাসে করে যাওয়া পড়ে। বর্তমান খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়ক দিয়ে বাড়িতে যেতে গেলেই ভয় লাগে। মনে হয়, এই বুঝি কিছু একটা হয়ে গেল। কারণ সড়কটি দিয়ে যাওয়ার পথে ছোট একটা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম।’

দুর্ঘটনা কমাতে যা বলছে কর্তৃপক্ষ

খুলনা হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘খুলনা-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। মহাসড়কে ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ছোট ও অননুমোদিত যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।’

খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমাতে কিছু স্থানে ছোট গতিরোধক বসানো হয়েছে। এ ছাড়া চালকদের সতর্ক করতে যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তা করছি।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর