Sunday 01 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে জার্মানিতে সহিংস বিক্ষোভ, দোকান লুটপাট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১ নভেম্বর ২০২৬ ২০:১৪

ফ্রাঙ্কফুর্টে অস্ত্র বিক্রয়কারী একটি দোকানের জানালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন বিক্ষোভকারীরা। রয়টার্স।

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে জার্মানির বিভিন্ন শহরে চলা বিক্ষোভ কর্মসূচি সহিংস রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার গভীর রাতে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের কেন্দ্রে দাঙ্গাকারীরা দোকানপাটে লুটপাট চালিয়েছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, শনিবার (৩১ অক্টোবর) জার্মানির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্ট ছাড়াও বার্লিন, কোলোন এবং হামবুর্গেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, বিক্ষোভকারীরা জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি, পাথর ও বোতল নিক্ষেপ করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে, দিনের শুরুতে হাজার হাজার মানুষ মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। ‘জেন জেড রেগেল্ট’ নামক একটি প্রচারণামূলক গোষ্ঠী এই বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল। ‘জেন জেড রেগেল্ট’এর অর্থ হলো ‘জেন জেড দায়িত্ব নিচ্ছে’। স্কুলগুলোতে অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং সামরিক পরিষেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোই ছিল তাদের প্রকৃত লক্ষ্য।

জার্মানির এই অস্থিরতার আগে ফ্রান্সেও তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। সেখানেও শনিবার ৩ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেয়।

রোববার (১ নভেম্বর) জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ডট দেশটির গণমাধ্যম ‘বিল্ড’ সংবাদপত্রকে জানান, পুলিশ রাতে এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্যারিসে দেখা গিয়েছিল। তিনি দাঙ্গাকারী ও লুটপাটকারীদের জন্য ‘কঠোর শাস্তির’ আহ্বান জানান।

রাতের বেলায় ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান কেনাকাটার রাস্তার একটি বড় অংশ পুলিশ বন্ধ করে দেয়। পুলিশের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, শহরটিতে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে প্রায় ১৮ হাজার বিক্ষোভকারী উপস্থিত ছিলেন যা আয়োজকদের ওয়েবসাইটের প্রাক্কলিত সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। জার্মান গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার জার্মানির বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে।

ফ্রাঙ্কফুর্টে ব্যাটম্যানের বেশধারী এক বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটক করেছে। রয়টার্স।

‘জেন জেড রেগেল্ট’-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেছেন, ‘এই বিক্ষোভগুলো ছিল যুদ্ধ ও জবরদস্তির পরিবর্তে শান্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করার জন্য।’

তিনি বললেন, ‘আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উন্নত সহায়তা। আমরা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিপক্ষে এবং আমরা দায়িত্বের আরও ন্যায়সংগত বণ্টনের পক্ষে।’

শনিবার রাতে ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ জানিয়েছিল, শহরের কেন্দ্রে ‘সহিংস দাঙ্গা’ চলছে এবং সেখানে পুলিশের বিশেষ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্যমতে, বেশ কয়েকটি দোকানের জানালা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং জরুরি সেবাদানকারী কর্মীদের লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল (আগ্নেয় বোমা) নিক্ষেপ করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি বন্দুকের দোকানের জানালা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে পুলিশ দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। এছাড়া আরও কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর চালিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী, যেমন-জুতো (ট্রেইনার্স) লুট করা হয়েছে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি যে হেসেন অঙ্গরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত, সেই অঙ্গরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক জানিয়েছেন, শহরের এই বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত ‘বামপন্থী চরমপন্থী অনুপ্রবেশ’ করেছিল। তিনি আরও বলেন, বিক্ষোভের পরিণতি যেভাবে হয়েছে, তা অত্যন্ত ‘লজ্জাজনক’।

তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সের সেই ঘটনাগুলো-লুটপাট, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, পুলিশের গাড়ি পোড়ানো এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার দৃশ্যগুলো আমাদের সবার মনেই রয়েছে… এ ধরনের পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ফ্রান্সকে কোনোভাবেই আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা যায় না।’

পুলিশ জানিয়েছে, রোববার রাত নাগাদ শহরে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।

জার্মানির অন্যান্য শহরেও অনেকটা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পর একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

কোলন শহরে পুলিশ জানিয়েছে, প্রধান রেল স্টেশনের কাছে তাদের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। এ সময় তাদের দিকে বোতল ছুড়ে মারা হয় এবং একটি সাইকেলও ছুড়ে ফেলা হয়।

কোলনের পুলিশ প্রধান জোহানেস হারমানস বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, তরুণরা যারা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে চেয়েছিল, তাদের মাঝে আজ এমন কিছু চরমপন্থী ঢুকে পড়েছিল যাদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল সহিংসতা।’

প্যারিসে বিক্ষোভের সময় প্রতিবাদকারীরা ঢাল ব্যবহার করছেন। রয়টার্স।

বার্লিন পুলিশ জানিয়েছে, দিনের বেলায় বড় ধরনের বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় সেখানে একটি ছোট আকারের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং ৫৬ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়।

হামবুর্গে কালো পোশাকধারী ব্যক্তিরা আতশবাজি ফোটায় এবং ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনডিআর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে ১২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ইউরোপের অন্যান্য স্থানে বড় আকারের বিক্ষোভের দিনেই জার্মানিতে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এদিকে, ফ্রান্সে টানা তৃতীয় সপ্তাহে ৩ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি লোক সারা দেশের শহরগুলোতে একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং দরিদ্র জনসেবা, বিশেষত শিক্ষা খাতে পদক্ষেপের দাবিতে তারা এ কর্মসূচি পালন করছে।

অন্যদিকে, ইতালিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। রোম ও তুরিনে পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

পর্তুগালে ভাড়াসংক্রান্ত একটি আইনের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছে। বিক্ষোভকারীদের মতে, এই আইনটি দেশটির আবাসন সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে-যেখানে গত এক দশকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।

সম্প্রতি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, গ্রিস, সার্বিয়া ও আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে মূলত তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে এসেছেন।

যদিও দেশভেদে দাবির বিষয়গুলো ভিন্ন, তবে বিক্ষোভকারীরা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে আবাসন সুবিধা, শিক্ষার মান এবং সরকারি পরিষেবা খাতে বরাদ্দ হ্রাস।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর