Wednesday 04 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

হাসিমুখের আড়ালে অন্তহীন কান্না ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’

ফারহানা নীলা
৪ নভেম্বর ২০২৬ ১৮:২৬

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, তার জীবনটা যেন একখণ্ড নিখাদ সুখের ক্যানভাস। ফেসবুকে তার হাসিমুখী ছবি, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা, আড্ডায় সবচেয়ে হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব পালনে সদা তৎপর এক মানুষ। অথচ দিন শেষে ছাদের আলো নিভলে কিংবা ঘরের দরজা বন্ধ হতেই সেই মানুষটিরই চোখের কোণে জমে ওঠে নোনতা জলের সমুদ্র। তিনি ভেতরে ভেতরে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছেন এক অদৃশ্য শূন্যতা ও যন্ত্রণায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই মানসিক অবস্থার নামই ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বা প্রচ্ছন্ন বিষণ্নতা, যেখানে মানুষ নিজের কষ্ট, হতাশা ও অবসাদকে হাসির নিখুঁত মুখোশের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখেন।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত বিষণ্নতা বলতে আমরা বুঝি এমন এক দশা, যেখানে মানুষ বিছানা ছেড়ে উঠতে চান না, একা থাকতে ভালোবাসেন, কান্নাকাটি করেন কিংবা জীবন থেকে গুটিয়ে যান। কিন্তু ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ এর ঠিক উল্টো। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস না হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে এটি অত্যন্ত পরিচিত ও বিপজ্জনক একটি টার্ম। এই ধরনের মানুষরা ভীষণ রকমের কর্মক্ষম ও দায়িত্বশীল হন। তারা চাকরি করেন, পড়ালেখা করেন, সংসার সামলান এবং সমাজকে সব ঠিকঠাক আছে বলে বিশ্বাস করান। অথচ তাদের মনের ভেতর এক তীব্র মানসিক লড়াই চলতে থাকে। দিনের পর দিন এই দ্বৈত জীবনযাপন করতে করতে তারা মানসিকভাবে চরম ক্লান্ত হয়ে পড়েন।

কেন মানুষ নিজের কষ্ট লুকিয়ে হাসির মুখোশ পরে থাকেন? এর পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। আমাদের সমাজ এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পুরোপুরি খোলামাঠের মতো সহজ হতে পারেনি। কেউ বিষণ্নতার কথা বললেই তাকে ‘দুর্বল’, ‘মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’ কিংবা ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা সমাজে রয়েছে। অনেকেই নিজের পরিবার বা প্রিয়জনদের উদ্বেগের মধ্যে ফেলতে চান না। তারা মনে করেন, নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করলে অন্যেরা কষ্ট পাবে কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিজের পেশাদারিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ফলে শত কষ্টের মাঝেও মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখাটাই তাদের কাছে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

স্মাইলিং ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো বোঝা বেশ কঠিন, কারণ ভুক্তভোগী নিজেই তা দারুণভাবে লুকিয়ে রাখেন। তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন; হঠাৎ করেই অতিরিক্ত ক্লান্তি ভর করা, ঘুমের চক্রে গোলযোগ দেখা দেওয়া, আগে যে কাজগুলো করে আনন্দ পেতেন সেগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, অতিরিক্ত পারফেকশনিজম বা সবকিছু নিখুঁত করার প্রচণ্ড তাগিদ এবং নিজের ভেতর এক ধরণের অপরাধবোধ কাজ করা। অনেক সময় দেখা যায়, এরা নিজেদের আবেগ চেপে রাখতে রাখতে হঠাৎ কোনো ছোট ঘটনায় ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অথবা দীর্ঘ সময় ধরে এক গভীর শূন্যতায় ভুগে থাকেন।

এই ধরনের নীরব বিষণ্নতা অনেক সময় মারাত্মক রূপ নিতে পারে। যেহেতু চারপাশের মানুষ মনে করেন ব্যক্তিটি বেশ ভালো ও হাসিখুশি আছেন, তাই হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে সবাই নিদারুণভাবে চমকে ওঠেন। ভেতরে জমে থাকা এই প্রচণ্ড চাপ একসময় আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। অথচ একটু সচেতনতা আর সহানুভূতি এই মানুষগুলোকে ফিরিয়ে আনতে পারে আলোর পথে।

স্মাইলিং ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো নিজের অনুভূতির মুখোমুখি হওয়া। সবকিছু নিখুঁত বা পারফেক্ট রাখার ইঁদুরদৌড় থেকে নিজেকে একটু ছুটি দেওয়া প্রয়োজন। নিজের দুর্বলতা বা কষ্টের কথাগুলো বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া জরুরি। মনের জমিন থেকে অন্ধকারের মেঘ কাটাতে পেশাদার মনোবিদের সাহায্য নেওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকার একটি সাহসী পদক্ষেপ।

পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত চারপাশের প্রিয়জনদের প্রতি আরেকটু যত্নশীল হওয়া। কোনো মানুষ সবসময় হাসিখুশি মানেই যে তার জীবনে কোনো কষ্ট নেই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। বন্ধু, সহকর্মী কিংবা পরিবারের কেউ অতিরিক্ত হাসিখুশি বা ব্যস্ত থাকার ভান করলেও তার চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করা উচিত। একটুখানি আন্তরিক খোঁজ, বিচারহীন মন নিয়ে শোনা এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়াই পারে একজন অন্তর্দহন ভোগা মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখাতে। হাসি কেবল আনন্দের প্রকাশ নয়, অনেক সময় তা হতে পারে অন্তহীন কান্নার নিঃশব্দ চিৎকার। সেই চিৎকার শুনতে পাওয়ার সচেতনতাই হোক আমাদের আগামী দিনের পথচলা।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর