Thursday 05 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রাজশাহী বইমেলা: বিরূপ আবহাওয়ার বিক্রি কম লোকসানের আশঙ্কা

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৩:৪১

মেলায় ক্রেতাদের উপস্থিতি কম থাকায় লোকসানের আশঙ্কা।

রাজশাহী: দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই রাজশাহী কালেক্টরেট মাঠ পরিণত হচ্ছে বইপ্রেমীদের এক সমাবেশে। শত শত মানুষের পদচারণা আর আড্ডায় মুখরিত হচ্ছে শিক্ষানগরীর এই সবুজ প্রাঙ্গণ। তবে এই উপচে পড়া জনস্রোত আর মানুষের বাঁধভাঙা ভিড়ের মাঝেও বিষাদের ছাপ এঁকেছে বিরূপ আবহাওয়া। মেলা শুরুর দুইদিনের টানা বৃষ্টিতে স্টল খুলতে না পারা এবং পরবর্তী দিনগুলোতে বিক্রির মন্দায় বিক্রেতাদের মনে জেঁকে বসেছে লোকসানের আশঙ্কা।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে রাজশাহী কালেক্টরেট মাঠে গত ২৯ অক্টোবর শুরু হয় বিভাগীয় গ্রন্থমেলা-২০২৬, যা চলবে আগামী ৬ নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু শুরুর দিকে ২৯ ও ৩০ অক্টোবর বৃষ্টির কারণে বিভাগীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হওয়া এই মেলা প্রায় বন্ধ ছিল।

বিজ্ঞাপন

মেলার নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ছুটির দিনে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং সাধারণ দিনে বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত থাকে পাঠকদের জন্য। মোট ৮০টি স্টলের এই মেলায় বইপ্রেমীদের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক হলেও শেষ পর্যন্ত তা কাঙ্ক্ষিত ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিতে পারছে না।

স্টল মালিক ও বিক্রয়কর্মীরা বলছেন, দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও তাদের বেশিরভাগই কেবল সময় কাটাতে বা ঘুরে দেখতে আসেন। স্টল ঘুরে বই কেনার আগ্রহ বেশ কম। ‘জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ’-এর ম্যানেজার কাব্য রাসেল আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘বেচা-বিক্রির অবস্থা একেবারেই ভালো না। গত চার দিনে আমাদের স্টলে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো, আমাদের প্রকাশিত বইগুলো মূলত গবেষণাধর্মী, যার প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কম। বর্তমানের তরুণ পাঠকরা গবেষণার চেয়ে গল্প ও ফিকশন ধরনের বইগুলোর প্রতি বেশি ঝুঁকছেন।’

হাওলাদার প্রকাশনী’র বিক্রয় প্রতিনিধি সেলিম হাওলাদার বলেন, ‘মেলার হালচাল ভালো না। মানুষ আসতেছে অনেক, ঘুরতেছে-ফিরতেছে কিন্তু বই কিনতেছে একদম কম। অনেক কম মানুষের হাতে বই দেখবেন।’

আরেক স্টলের ম্যানেজার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘জঘন্য অবস্থা। কেনাবেচা নাই। প্রকাশনী লোকসানে আছে।’

অবশ্য এর বিপরীতে ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। অনন্যা প্রকাশনী’র বিক্রয় প্রতিনিধি মো. কামাল হাসান বলেন, ‘প্রথম দিকে বিক্রি কম হলেও বর্তমানে বিক্রি মোটামুটি বেশ ভালো। আমরা ফিকশন, গোয়েন্দা, গল্প-উপন্যাসের বইগুলো বিক্রি করছি, এগুলো বেশ চলছে। প্রায় পাঁচ শতাধিক বই বিক্রি করেছি।’

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মেলায় ৩১ অক্টোবর সব স্টল মিলিয়ে মোট বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৪২ টাকার বই, ১ নভেম্বর তা কমে ২ লাখ ৭০ হাজার ৭৫০ টাকায় দাঁড়ায়। পরবর্তী দিন ২ নভেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩ হাজার টাকায়।

মানুষের উপস্থিতি ও বিক্রির এই বিপরীত বৈপরীত্য প্রসঙ্গে আয়োজক পক্ষের প্রতিনিধি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগীয় বইমেলার আজ সপ্তম দিন চলছে। মেলার সার্বিক পরিস্থিতি ও বইয়ের বিক্রি মোটামুটি সন্তোষজনক বললেও আবহাওয়ার অপ্রত্যাশিত বাধার কারণে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। স্টল মালিকদের পক্ষ থেকে মেলার সময় বাড়ানোর বিষয়ে জোর দাবি তোলা হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেছি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারা নেবেন। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সময় বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম।’

মেলায় সর্বাধিক বিক্রি হওয়া বইয়ের মধ্যে উপন্যাস ও কথাসাহিত্য ক্যাটাগরিতে রয়েছে মাহমুদ রহমানের ‘জেল থেকে জেলে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘তোমাকে’, ‘হিমু সমগ্র’ ও ‘মিসির আলি সমগ্র’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ ও ‘শবনম’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ এবং আহমদ ছফার ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’, ‘গাভি বৃত্তান্ত’, ‘পুষ্পবৃক্ষ’, ‘ওঙ্কার’ ও ‘বাঙালি মুসলমানের মন’।

সায়েন্স ফিকশন ও বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ের তালিকায় রয়েছে দীপ মাহমুদের ‘সায়েন্স ফিকশন সমগ্র-১’, সৌমেন সাহার ‘বিজ্ঞানের শত সৃজনশীল প্রজেক্ট’ এবং মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘রিসার্চ সেন্টার’ বা সংশ্লিষ্ট গ্রন্থ। গোয়েন্দা ও কিশোর ক্ল্যাসিক সিরিজের মধ্যে রয়েছে রকিব হাসানের ‘গোয়েন্দা সমগ্র’ এবং শাহ আলম সাজুর ‘চার গোয়েন্দা ভয়ংকর জঙ্গলে’।

মহাকাব্যের ক্যাটাগরিতে রয়েছে বাল্মীকি রচিত ‘রামায়ণ’, বেদব্যাস রচিত ‘মহাভারত’ এবং হোমারের মহাকাব্য ‘ওডিসি’ ও ‘ইলিয়ড’। এছাড়া শিশুতোষ ও কিশোর সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে শিশুতোষ গল্প, রূপকথার গল্প ও ‘কিশোর আনন্দ’। অনুবাদ সাহিত্যের প্রাচীন নাটক, উপন্যাস এবং শ্রেষ্ঠ গল্প নিয়ে রয়েছে বিশেষ কিছু সংকলন। ক্যারিয়ার, স্কিল ও আত্মউন্নয়নমূলক বইয়ের তালিকায় রয়েছে মুনজেরিন শহীদের ‘ঘরে বসে IELTS প্রস্তুতি’ ও সংশ্লিষ্ট বইসমূহ।

এদিকে মেলায় ঘুরতে এসে সন্তোষ প্রকাশ করছেন দর্শনার্থীরা। রাজশাহী স্যাটেলাইট টাউন হাইস্কুলের লাইব্রেরিয়ান মৌসুমী জাহান বলেন, ‘স্কুলের বাচ্চাদের নিয়ে বইমেলা ঘুরতে এসেছি। এর আগে যখন মেলা হয়েছিল তখনও এসেছিলাম। বাচ্চাদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে বইমেলা যথোপযুক্ত একটা জায়গা।’

একই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সামিউল ইসলাম বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে, ‘বইমেলায় ঘুরতে এসে অনেক ভালো লাগছে। সহপাঠীদের নিয়ে এসেছি। আমার পছন্দের লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা বইসহ নানা ধরনের বই ঘুরে ঘুরে দেখলাম।’

আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘বইয়ের কালেকশন ভালো। বেশ বৈচিত্র্যময় বই রয়েছে। তবে বইয়ের দাম বেশ চড়া। দাম কমানোর বিষয়ে ভাবার জন্য প্রকাশনী মালিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

এমন আয়োজন সবসময় হওয়া প্রয়োজন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর বইমেলা হওয়া দরকার। বই পড়া থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। মেলার আয়োজন আমাদের বইমুখী করবে বলে বিশ্বাস করছি।’

অন্যদিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মেলা আয়োজনের জন্য আরও দারুণ দারুণ জায়গা রয়েছে রাজশাহী নগরীতে। কিন্তু প্রশাসন প্রতিবছর শহরের এককোণায় মেলার আয়োজন করে এবং সেখানে বৃষ্টি নামলেই পানি জমে চলাফেরার অনুপযোগী হয়ে ওঠে। তাছাড়া তেমন কোনো প্রচারে করা হয় না। ফলে বিশাল একটা সংখ্যা জানতেই পারে না যে মেলা হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত যথোপযুক্ত সময় ও স্থান নির্বাচন করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা চালানো।’

সারাবাংলা/এএ