Sunday 18 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরে নারীদের জন্য তৈরি কারখানা পেল মর্যাদাপূর্ণ ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:০৯

গ্রিন ফিল্ড কারখানা।

রংপুর: প্রকৃতি, সবুজ পরিবেশ ও শ্রমিকবান্ধব নকশার অনন্য সমন্বয়। বাংলাদেশের রংপুরে অবস্থিত সাততলা গ্রিন ফিল্ড কারখানা জিতেছে ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’। প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের কর্মস্থল এই কারখানার অধিকাংশ কর্মী নারী। কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের সুস্থতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে ভবনটি।

বাংলাদেশের স্থাপত্য খাতে নতুন গৌরব যোগ করেছে রংপুরের এই গ্রিনফিল্ড কারখানা। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (রিবা) আয়োজিত আন্তর্জাতিক এ পুরস্কারটি ১৫ অক্টোবর ঘোষণা করা হয়। কারুপণ্য রংপুর লিমিটেডের এই কারখানার নকশা করেছে বাংলাদেশের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টস। বিচারকদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ২০২৬ সালের বিজয়ী নির্বাচিত হয় ভবনটি।

বিজ্ঞাপন

কারখানার নকশায় বাংলার ঐতিহ্য ও প্রকৃতি

রংপুরের রবার্টসনগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত কারখানাটি প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের। সাততলা ভবনটির নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ির বৈশিষ্ট্য। গ্রামের বাড়ির মতো উঠান, পুকুর, বাগান ও ছায়াঘেরা বারান্দাকে আধুনিক শিল্প স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ভবনের দেয়ালজুড়ে রয়েছে নানা ধরনের গাছপালা। পাশাপাশি আছে সবুজে ঘেরা বারান্দা, খোলা প্রাঙ্গণ, জলাশয় ও হাঁটার পথ। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কাজের পাশাপাশি বিশ্রাম ও অবসর কাটানোর সুযোগও রয়েছে।

 

স্থাপত্যবিষয়ক ওয়েবসাইট আর্কডেইলির তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির নকশায় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল এবং পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শীতলীকরণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলাশয়ের ওপর দিয়ে আসা বাতাসের তাপমাত্রা কমিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবাহিত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। এতে যান্ত্রিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

গ্রিন ফিল্ড কারখানা।

নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা

গ্রিন ফিল্ড কারখানার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো শ্রমিকদের কল্যাণকে নকশার কেন্দ্রে রাখা। এখানে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর মধ্যে অধিকাংশই নারী। তাদের দৈনন্দিন কাজের সুবিধা ও সুস্থতার কথা বিবেচনা করে ভবনে রাখা হয়েছে শিশুদের দেখাশোনার কেন্দ্র, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বিশ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য ছায়াঘেরা জায়গা।

এ ছাড়া কর্মীদের জন্য রয়েছে খাবারের ক্যানটিন, প্রার্থনার স্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুবিধা। ছাদে শিশুদের যত্নকেন্দ্রের পাশে তৈরি করা হয়েছে বাগান, যেখানে কর্মীরা অবসর কাটাতে ও দুপুরের খাবার খেতে পারেন। কারখানাটির বিভিন্ন বাগান ও খোলা জায়গা কর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

ভবনের প্রবেশপথে রয়েছে ‘বনলতা’ নামের একটি নারী অবয়বের ভাস্কর্য। এটি নারীর ক্ষমতায়ন, শক্তি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। কারখানার স্থপতিরা মনে করেন, কর্মীদের শুধু উৎপাদনশীলতার উপকরণ হিসেবে না দেখে তাঁদের প্রয়োজন, স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

শ্রমিক ও মালিকের জন্য একই প্রবেশপথ

কারখানাটির নকশায় কর্মক্ষেত্রের প্রচলিত সামাজিক বিভাজন কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশে অনেক বড় কারখানায় শ্রমিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রবেশপথ আলাদা থাকে। তবে গ্রিন ফিল্ড কারখানায় শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক-সবাই একই প্রধান প্রবেশপথ ব্যবহার করেন।

রিবার বিচারকমণ্ডলীর প্রধান বিজয় জৈন এই প্রবেশপথকে সবার জন্য সমান মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, ভবনটির বিশেষত্ব হলো-এখানে মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য একটি অভিন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

রিবা জার্নাল সূত্রে জানা গেছে, পুরস্কার ঘোষণার সময় বিচারকেরা ভবনটিকে ‘নীরব বিনয়ের এক অনন্য কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁদের মূল্যায়নে, এটি এমন এক শিল্পভবনের উদাহরণ, যেখানে স্থাপত্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।

‘কারখানা মানুষের শক্তি ফিরিয়েও দিতে পারে’

নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ এম. খন্দকারের ভাবনায়, কারখানা কেবল উৎপাদনের জায়গা নয়; এটি এমন একটি স্থান হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ কাজ করার পাশাপাশি স্বস্তি ও প্রেরণা পাবে।

তিনি বলেন, ‘কারখানা যেন শুধু মানুষের শ্রম ও শক্তি ব্যবহার না করে, বরং কর্মীদের মানসিক স্বস্তি ও সুস্থতাও ফিরিয়ে দেয়। এই ধারণা থেকেই ভবনটির প্রতিটি উঠান, বাগান, জলাশয় ও ছায়াঘেরা বারান্দার পরিকল্পনা করা হয়েছে।’

স্থপতিদের লক্ষ্য ছিল, কর্মীদের জন্য কারখানাকে যতটা সম্ভব ঘরোয়া ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করে তোলা। এ কারণে ভবনটির নকশায় শুধু উৎপাদনকেন্দ্রিক জায়গা নয়, বিশ্রাম, পারস্পরিক যোগাযোগ ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার সুযোগও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের শিল্প খাতে নতুন দৃষ্টান্ত

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান বস্ত্র ও তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। তবে এ খাতের কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করে। ভবনটির কাঠামোগত ঝুঁকির পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত অভিযোগ উপেক্ষা করার বিষয়টিও ওই বিপর্যয়ের আলোচনায় উঠে আসে।

এ প্রেক্ষাপটে গ্রিন ফিল্ড কারখানা শিল্পভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখানে উৎপাদনের প্রয়োজনের পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা, সুস্থতা, বিশ্রাম এবং মর্যাদার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে স্থাপত্যের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি শ্রমিকদের বাস্তব কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জয়

রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ২০১৬ সালে চালু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যকর্মের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা, নকশার উৎকর্ষ এবং মানুষের জীবন ও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির সক্ষমতাকে এ পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

২০২৬ সালের সংক্ষিপ্ত তালিকায় বাংলাদেশের আরও একটি প্রকল্প ছিল-ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। বাকি দুটি প্রকল্প ছিল বেলজিয়ামের একটি সংস্কার করা পুরোনো অফিস ভবন এবং একটি সম্প্রসারিত শিল্পকলা প্রতিষ্ঠান।

রংপুরের গ্রিন ফিল্ড কারখানার এই অর্জন বাংলাদেশের স্থাপত্যকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার নকশা নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এর মূল বার্তা হলো, একটি কারখানার সাফল্য শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নয়; সেখানে কর্মরত মানুষের জীবন, স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়েও বিবেচনা করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট কারুপণ্য প্রতিষ্ঠা করেন প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল আলম সেলিম। এখানে প্রধান পণ্য ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি, হাতে তৈরি কার্পেট, দরজার পাপোশ, গোসলখানার ম্যাট, বেডশিট, কুশন কভার, শাড়ি, পাঞ্জাবি ও থ্রি-পিস। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৭,০০০ (প্রধানত গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত নারী) শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর