Saturday 24 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যশোরে এক মণ্ডপে ২ বার দুর্গাপূজা, ৪ দিন পর বিসর্জন

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৩৫

যশোর সদরের কৈখালী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের প্রতিমা।

যশোর: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শেষ হয়েছে ২১ অক্টোবর। দেশের সব মণ্ডপে দেবীর বিসর্জন হলেও, বিসর্জন হয়নি যশোর সদরের কৈখালী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের প্রতিমা। বরং বিসর্জন থামিয়ে ওই মণ্ডপে দ্বিতীয় দফায় আয়োজন করা হয় দুর্গাপূজার।

ঢাকের বাদ্য থেমেছে, বিসর্জনের প্রস্তুতি শেষ। বিদায়ের ক্ষণে দেবী দুর্গাকে চোখের জলে বিদায় জানানোর কথা ভক্তদের। কিন্তু বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতির সময় এক নারীর অস্বাভাবিক আচরণ ও তার ওপর দেবী দুর্গার ভর করার দাবি ঘিরে এই ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। গ্রামবাসীর সিদ্ধান্তে নতুন করে আয়োজন করা হয় পূজার। চারদিন ধরে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ব্যতিক্রমী এ দুর্গোৎসব।

বিজ্ঞাপন

আয়োজকেরা জানান, গত বুধবার বিজয়া দশমীর দিন বিকেলে যখন প্রতিমা বিসর্জনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই মণ্ডপে ঘটে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। প্রতিমার সামনে আচমকাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন সবিতা রানি ঘোষ নামে এক নারী। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেই অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন তিনি। তিনি গ্রামবাসীকে জানান, অশৌচ থাকা লোকজন পূজায় অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে পুরোহিত খেয়েছেন মাছ-মাংস। ফলে মায়ের পূজা সঠিকভাবে হয়নি। তাই অমঙ্গল এড়াতে এবং গ্রামের কল্যাণে নতুন করে দিতে হবে পূজা। দৈববাণী অমান্য করলে গ্রামে ঘটবে বড়ো বড়ো দুর্ঘটনা।

মন্দির প্রাঙ্গণে সেইদিন উপস্থিত শত শত লোক এমন দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে যান। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেন পুনরায় নিয়ম মেনে পূজা করার। দৈববাণী রক্ষা ও গ্রামের মঙ্গল কামনায় প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে মণ্ডপেই শুরু হয় দ্বিতীয় দফার আয়োজন। প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে নতুন পুরাহিতের মাধ্যমে প্রথম দফার নিয়ম অনুসারেই চারদিনে শেষ হয় মহাষষ্ঠী থেকে মহানবমী। সব শঙ্কা কাটিয়ে শনিবার সকালে দ্বিতীয় দফার দশমীর ঘট পূজা আর বিকেলে প্রতিমা বির্সজনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই আয়োজনের।

সবিতা রানি ঘোষ বলেন, ‘আমি বিজয়া দশমীর দিন পূজা দেখতে এসেছিলাম। তারপর কি হয়েছিলো আমি জানি না। আমি অচেতন হয়ে পড়ে যাই। পরে শুনি আমার শরীরে নাকি দেবী মা ভর করেছিলেন।’

কৈখালী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক গণেশ কুমার বলেন, ‘গত ১৬ অক্টোবর থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশের মত এই মন্দিরেও দুর্গাপূজা হয়েছে। ২১ অক্টোবর বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বিভিন্ন পূজা শেষে নারীরা সিঁদুর খেলাও শুরু করেন। এ সময় সবিতা রানি ঘোষ নামে এক বিধবা নারী অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে চোখমুখে পানি দিয়ে জাগ্রত করি। এর পরই ওই নারী দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলা শুরু করেন যে এই মন্দিরের দুর্গাপূজায় ত্রুটি ছিল, সঠিকভাবে পূজা হয়নি, অশৌচ থাকা লোকজন পূজায় অংশ নিয়েছেন, একই সঙ্গে পুরোহিত মাছ-মাংস খেয়ে পুজো করেছেন—এজন্য মায়ের পূজা সঠিকভাবে হয়নি। পুনরায় পূজা না করলে গ্রামবাসীর বড়ো ধরনের ক্ষতি হবে।’

গণেশ বলেন, ‘এই ঘটনা ঘটার আগের রাতে আমাদের এলাকার কিছু মানুষ নড়াইলে পূজা দেখতে যাচ্ছিল, তখনই তারা দুর্ঘটনায় পতিত হন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। পরে অশৌচ থাকা ব্যক্তিদের খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা পূজা দিয়েছে। একই সঙ্গে এলাকায় দুর্ঘটনার বিষয়টি সামনে আসলে মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত শত শত লোক ভয় পেয়ে যান। এরপর তারা সিদ্ধান্ত নেন পুনরায় নিয়ম মেনে মায়ের পূজা করা হবে। প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত করে গত শুক্রবার ও শনিবার ঘটে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী পূজা করা হয়েছে। শনিবারও সকালে বিজয়া দশমী ও সিঁদুর দান সম্পন্ন হয়েছে।’

সভাপতি মিলন কুমার রায় বলেন, ‘১০০ বছরের বেশি সময় ধরে দূর্গা পূজার আয়োজন হলেও এবার ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। খরচ বেশি হলেও সবার মঙ্গলের জন্য ফের পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা ছিল। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে দেবী দূর্গাকে নতুন করে পূজা করা হয়েছে। বির্সজনের মাধ্যমে দেবী ভুলত্রুটি ক্ষমা করে পাড়ার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শান্তিতে ভরিয়ে দেবেন এমনটা আশা করি।’

মন্দিরের পুরহিত উজ্জল কুমার চ্যাটার্জী বলেন, ‘শাস্ত্রে দ্বিতীয় দফায় দুর্গাপূজার নিয়ম না থাকলেও এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় ঘট পেতে ফের পূজার আয়োজন করা হয়। দেবীর তুষ্টি আর গ্রামের সার্বিক কল্যাণের আশায় শনিবার বিকেলে ধর্মীয় আচার মেনে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।’

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার প্রেক্ষিতে কৈখালি গ্রামে দুইবার দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় তারা পূজা করেছে।’