Saturday 07 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

১৪৮ বছরেও বি-গ্রেডেই আছে রংপুর রেলস্টেশন, ঢাকাগামী ট্রেন মাত্র দুটি

রাব্বী হাসান সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৭ নভেম্বর ২০২৬ ১০:০২

রংপুর রেলওয়ে স্টেশন

রংপুর: রংপুরের বিভাগীয় নগরীর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর রেলওয়ে স্টেশন আজও বি-গ্রেডের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। দেড়শ বছরের পুরনো এ স্টেশনে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম, নেই ফুটওভারব্রিজ বা নিরাপত্তা বেষ্টনী। অথচ প্রতিদিন গড়ে সাত হাজার যাত্রী এ স্টেশন ব্যবহার করছেন। রংপুরবাসীর দাবি—অবিলম্বে ঢাকাগামী রেলের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্টেশনটির এ-গ্রেডে উন্নীতকরণ এবং দেড়শ বছরের পুরনো এ স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন।

রংপুর রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৮ সালের ২ জুলাই। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে দর্শনা-জগতি রেলপথ চালুর পর জেলা সদরের মধ্যে রংপুরেই সর্বপ্রথম রেলস্টেশন স্থাপিত হয়। বুড়িমারী-লালমনিরহাট-পার্বতীপুর লাইনের পার্বতীপুর-কাউনিয়া অংশে অবস্থিত এ স্টেশনটি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৪ সালে একবার বড় ধরনের সংস্কার হয়। এরপর দেড়শ বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম হয়নি। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও স্টেশনটি এখনো বি-গ্রেডেই রয়ে গেছে। জেলা রংপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশন হয়েছে, প্রতিষ্ঠা হয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ, বেড়েছে জনসংখ্যা—কিন্তু স্টেশনের মর্যাদা বদলায়নি।

বিজ্ঞাপন

নগরীর একমাত্র প্রধান সড়কে চাপ, যানজট নিত্যদিনের

রংপুর রেলস্টেশন থেকে শহরের বুক চিরে পশ্চিম প্রান্তে মেডিকেল মোড়ে হাইওয়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে স্টেশন রোড বা মেইন রোড। নগরের সব কার্যক্রম এ একটি সড়ককে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। পরিবহণ ও মানুষের সংখ্যা বহুগুণ বাড়লেও নতুন সড়ক না থাকায় নিত্য যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। নগরের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে স্টেশন এলাকায় ব্যক্তিগত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। এখানে চাল, গম, আটা ও তেলের কিছু পাইকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যোগাযোগ সুবিধার কারণে এলাকাটি উত্তরাঞ্চলের খাদ্যপণ্যের পাইকারি বাজার হিসেবে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে-কলমে, বাস্তবে শুধু প্ল্যাটফর্ম উঁচু

২০২১ সালে রংপুর রেলস্টেশনের উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পে ছিল ছয়তলা ভবন নির্মাণ, রেলের সমান প্ল্যাটফর্ম, প্ল্যাটফর্ম উঁচুকরণ, বিপরীত দিকে আরেকটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ। কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি বলতে শুধু প্ল্যাটফর্ম উঁচুকরণের কাজটুকুই হয়েছে।

স্টেশন সুপারিনটেনডেন্ট আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, সরকার পরিবর্তনের কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ রেখেছে; দ্রুতই উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করছেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের চারদিক এখনো খোলা। রাত হলে মাদকসেবী ও অপরাধীদের আড্ডা বসে এখানে। যাত্রীদের অভিযোগ, বিভাগীয় শহরের স্টেশনে বিশ্রামাগার ও শৌচাগারের অবস্থাও শোচনীয়—একটি মাত্র টয়লেটে নারী-পুরুষ উভয়কেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

ট্রেন সংখ্যা কম, টিকিট মেলে না

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রংপুর স্টেশন দিয়ে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস, উত্তরবঙ্গ মেইল, দিনাজপুর কমিউটারসহ সাত জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে ঢাকাগামী ট্রেন মাত্র দুটি—রংপুর এক্সপ্রেস ও কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। রংপুর এক্সপ্রেসে রংপুরের জন্য আসন বরাদ্দ মাত্র ১৯৯টি এবং কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে ১৫৪টি। চাহিদার ১৫-২০ শতাংশ টিকিটও সরবরাহ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এর ওপর শিডিউল ঠিক না থাকায় ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়; কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় যাত্রীদের। স্টেশনের পশ্চিমে বন্দর শ্যামপুর ও পূর্বে মীরবাগ বাজার স্টেশনও বি-গ্রেডের। কাউনিয়া রেলস্টেশন এ-গ্রেডের হওয়া সত্ত্বেও জেলার মূল স্টেশনটি বি-গ্রেডের থাকায় নগরবাসীর ক্ষোভ বেড়েছে।

রেল অবকাঠামো উন্নয়নেও ধস

রংপুরের রেল যোগাযোগের অন্যান্য প্রকল্পগুলোও বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তার মুখে। কাউনিয়া থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ৫৭ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১৮ সালে, ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরু হয়নি; ভারতীয় অর্থায়ন না পাওয়ায় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া তিস্তা রেলসেতু সংলগ্ন নতুন সেতু নির্মাণ ও বাইপাস রেলপথের সমীক্ষাও ফাইলবন্দি হয়ে আছে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। এসব প্রকল্প আটকে থাকায় উত্তরাঞ্চলের রেল সংযোগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।

নাগরিক সমাজ ও যাত্রীদের দাবি

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘যেখানে কাউনিয়া উপজেলার স্টেশনটি এ গ্রেডের, সেখানে রংপুর জেলা স্টেশনটি বি-গ্রেডের—এটি মেনে নেওয়া কষ্টকর। দেড়শ বছর পুরনো রেলস্টেশনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন রংপুর হবে এক নম্বর জেলা, সেটার বাস্তবায়ন আমরা দেখিনি। বিএনপি সরকার রংপুর রেলস্টেশনের উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এ প্রত্যাশা সবার।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর