সমুদ্রের ঢেউ কখনো মায়াবী, কখনো নির্মম। ঠিক সেই নির্মম রূপের কাছেই হারিয়ে গেলেন টলিউডের প্রতিভাবান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। পর্দার মানুষটির এমন আকস্মিক প্রস্থান যেন বিশ্বাস করাও কঠিন। কয়েক মুহূর্ত আগেও যিনি অভিনয়ে মগ্ন ছিলেন, তিনিই হঠাৎ নিথর হয়ে গেলেন সমুদ্রের বুকে।
শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেই ঘটেছিল এই দুর্ঘটনা। গল্পের প্রয়োজনে সমুদ্রের অগভীর জলে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছিলেন রাহুল ও সহশিল্পী শ্বেতা মিশ্র। শুরুতে সবকিছু ছিল স্বাভাবিক, পানির গভীরতা ছিল মাত্র গোড়ালি পর্যন্ত। ক্যামেরা চলছিল, দৃশ্য এগোচ্ছিল, আর হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই তৈরি হচ্ছিল এক স্বাভাবিক পরিবেশ।
কিন্তু সমুদ্র কখনো একই থাকে না। অজান্তেই তারা ধীরে ধীরে আরও ভেতরের দিকে এগিয়ে যান। হাঁটু সমান পানি হঠাৎ যেন অন্য রূপ নেয়। এক মুহূর্তের অসতর্কতা, একটুখানি ভারসাম্য হারানো। আর তাতেই বদলে যায় সবকিছু।
পরিচালকের বর্ণনায় উঠে আসে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত। বিস্তারিত জানিয়ে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল জানিয়েছেন ; রোববার পশ্চিমবঙ্গের তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং চলছিল। একটি দৃশ্যে রাহুল ও অভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র অল্প পানিতে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছিলেন। শুরুতে গোড়ালি সমান জলে থাকলেও ধীরে ধীরে তারা সমুদ্রের ভেতরের দিকে এগোতে থাকেন।
শুটিংয়ের সময় শ্বেতা মিশ্র মজার ছলে পানি ছিটাচ্ছিলেন। এ সময় রাহুল তার হাত ধরে আরও একটু ভেতরের দিকে যান। ঠিক তখনই ঘটে বিপত্তি।
পরিচালক জানান, হাঁটু সমান জলে পৌঁছানোর পর হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন রাহুল। ইউনিট থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও মুহূর্তের মধ্যে পানি গলা পর্যন্ত উঠে যায়। এরপরই তিনি হাবুডুবু খেতে শুরু করেন এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তলিয়ে যান।
ঘটনা বুঝতে পেরে ইউনিটের সদস্যরা দ্রুত জলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রায় ১০ থেকে ১২ জন মিলে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আশপাশে থাকা নৌকা থেকেও দড়ি ফেলে সাহায্য করা হয়। অবশেষে তাকে পানির বাইরে তোলা সম্ভব হয়।
এরপর দ্রুত দিঘা মহকুমা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিচালকের এই বর্ণনা থেকে প্রাথমিকভাবে কিছু বিষয় ধারণা করা হচ্ছে, শুটিং চলাকালীনই দুর্ঘটনাটি ঘটে। সমুদ্রের পানির গভীরতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য। সমুদ্র কখনো অবহেলার জায়গা নয়। শান্ত দেখালেও তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অজানা গভীরতা, অপ্রত্যাশিত স্রোত। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই আনন্দময় একটি মুহূর্ত পরিণত হতে পারে চিরবিদায়ে।
রাহুলের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি এক সতর্কবার্তাও। শুটিংয়ের কৃত্রিম জগত আর বাস্তবের প্রকৃতি। এই দুইয়ের সংঘাতে কখন যে বিপদ এসে দাঁড়ায়, তা বোঝা যায় না। জীবনের মতোই সমুদ্রও অনিশ্চিত, আর সেই অনিশ্চয়তার কাছেই হার মানলেন একজন শিল্পী।
পর্দার বাইরে রাহুলের এই বিদায় যেন আরও গভীর, আরও বেদনাদায়ক। সহকর্মীদের চোখে জল, ভক্তদের মনে শোক। সব মিলিয়ে এখন ‘রাহুল’ এক অকালপ্রয়াণের গল্প।