বিশ্ব মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে হিপ-হপ বা র্যাপ গানকে যারা শুধু একটি ঘরানার মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে আসে ক্রিস্টোফার জর্জ লেটোর ওয়ালেস-এর নাম। বিশ্ব যাকে একনামে ‘নোটোরিয়াস বি.আই.জি.’ (The Notorious B.I.G.) বা ‘বিগি স্মলস’ হিসেবে চেনে। ১৯৭২ সালের ২১ মে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া এই বিশ্বখ্যাত আমেরিকান র্যাপার ও হিপ-হপ মিউজিক লিজেন্ডের জন্মদিন আজ। বিংশ শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে যখন আমেরিকান র্যাপ মিউজিক এক চরম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন বিগি তার অসাধারণ কণ্ঠশৈলী, বাস্তবসম্মত লিরিক এবং চমৎকার গল্প বলার ভঙ্গির মাধ্যমে পূর্ব উপকূলীয় (East Coast) হিপ-হপ দৃশ্যপটকে একাই পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। মাত্র ২৪ বছরের এক সংক্ষিপ্ত জীবন পেলেও মিউজিক দুনিয়ায় তিনি যে গভীর ও কালজয়ী প্রভাব রেখে গেছেন, তা আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সঙ্গীতপ্রেমী এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অবিরত অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
ব্রুকলিনের রাস্তা থেকে ব্যাড বয় রেকর্ডসের রাজসিংহাসন
ব্রুকলিনের সাধারণ ও কিছুটা অপরাধপ্রবণ রাস্তায় বেড়ে ওঠা ক্রিস্টোফার ওয়ালেসের শৈশব ও কৈশোর মোটেও সহজ ছিল না। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখা বিগি তার সেই অভিজ্ঞতাগুলোকেই পরবর্তীতে গানের মূল উপজীব্য হিসেবে বেছে নেন। ১৯৯৩ সালে বিখ্যাত প্রযোজক শন ‘পাফ ড্যাডি’ কম্বসের হাত ধরে তার নবগঠিত ‘ব্যাড বয় রেকর্ডস’-এ যোগ দেওয়ার পর বিগির পেশাদার মিউজিক ক্যারিয়ারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রেডি টু ডাই’ (Ready to Die)। এই একটি মাত্র অ্যালবাম হিপ-হপ দুনিয়ার পুরো সমীকরণ বদলে দেয়। অ্যালবামের ‘জুসি’ (Juicy) এবং ‘বিগ পাপা’ (Big Poppa) এর মতো গানগুলো বিলবোর্ড চার্টের শীর্ষস্থান দখল করে নেয়। বিগি তার গানে কোনো কাল্পনিক আখ্যান তৈরি না করে ব্রুকলিনের রাজপথের দারিদ্র্য, সংগ্রাম, হতাশা ও সফলতার গল্প এত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে সমালোচক,সবাই তার গানের ভক্ত হতে বাধ্য হন।
কালজয়ী সৃষ্টি ও বিশ্ব সংগীতাঙ্গনে চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার
নোটোরিয়াস বি.আই.জি. কেবল একজন ভালো লিরিসিস্টই ছিলেন না, বরং তার চমৎকার রাইমিং টেকনিক এবং যেকোনো বিটের সাথে কণ্ঠের দারুণ ওঠানামা বা ‘ফ্লো’ ছিল অনন্য। ওয়েস্ট কোস্ট বা পশ্চিম উপকূলের হিপ-হপ সংগীতের তুমুল জনপ্রিয়তার মুখে তিনি নিউইয়র্ক তথা ইস্ট কোস্ট হিপ-হপকে আবার মূল ধারার জনপ্রিয়তায় ফিরিয়ে আনেন। ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে এক মর্মান্তিক ও রহস্যময় বন্দুক হামলায় এই অসামান্য প্রতিভাবান শিল্পীর জীবনপ্রদীপ অকালে নিভে যায়। তার মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পর মুক্তি পায় তার দ্বিতীয় এবং দ্বি-খণ্ডের আইকনিক অ্যালবাম ‘লাইফ আফটার ডেথ’ (Life After Death)। অ্যালবামটি মার্কিন মিউজিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং সফল অ্যালবাম হিসেবে স্থান করে নেয়, যা পরবর্তীতে ডায়মন্ড সার্টিফিকেশন লাভ করে। এই অ্যালবামের ‘হাইপনোটাইজ’ (Hypnotize) এবং ‘মো মানি মো প্রবলেমস’ (Mo Money Mo Problems) গানগুলো বিশ্বজুড়ে কালজয়ী ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। ২১ মে তার এই জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে হিপ-হপ সংস্কৃতির ধারকেরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন সুরের এই মুকুটহীন সম্রাটকে, যিনি বেঁচে আছেন তার প্রতিটি লিরিক আর বিটের মাঝে।