সঙ্গীতের সুরে যিনি বদলে দিয়েছিলেন বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ, আর গানের খাতার কবিতা দিয়ে জয় করেছিলেন সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কার, তিনি আর কেউ নন, বিশ্বখ্যাত মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার ও সংস্কৃতির জীবন্ত রূপক বব ডিলান। আজ ২৪ মে, গীতি-কবিতার এই মহান জাদুকরের জন্মদিন। ১৯৪১ সালের আজকের দিনে আমেরিকার মিনেসোটাতে জন্ম নেওয়া রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান নামের সেই সাধারণ তরুণটিই পরবর্তীতে বিশ্বমঞ্চে হয়ে ওঠেন কালজয়ী ‘বব ডিলান’। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি কেবল গানই গাননি, বরং গিটার আর মাউথ অর্গানের যুগলবন্দিতে মার্কিন ফোক ও রক মিউজিককে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সারাবাংলা.নেট-এর পাঠকদের জন্য আজ তার জন্মদিনে থাকছে এই রক কিংবদন্তির জীবনের কিছু দারুণ মজার ও আজব তথ্য, যা হয়তো অনেকেরই অজানা।
ছদ্মনামের আড়ালে আসল মানুষ
বব ডিলান নামটা বিশ্বজুড়ে এক নামে পরিচিত হলেও, এটি কিন্তু তার আসল নাম নয়। আইরিশ কবি ডিলান থমাসের প্রতি মুগ্ধতা থেকে তিনি নিজের নাম রবার্ট জিমারম্যান থেকে বদলে ‘বব ডিলান’ করেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, এটিই তার একমাত্র ছদ্মনাম নয়; ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে তিনি এলস্টন গান, ব্লাইন্ড বয় গ্রন্ট, জ্যাক ফ্রস্ট এবং বু উইলবারির মতো নানা অদ্ভুত ছদ্মনামে গান গেয়েছেন ও রেকর্ড প্রযোজনা করেছেন। ডিলানের এই খামখেয়ালি স্বভাব কিন্তু কিশোর বয়স থেকেই ছিল। তিনি যখন দশম শ্রেণীতে পড়েন, তখন হাইস্কুলের এক ট্যালেন্ট শোতে তার গান গাওয়া ও পারফর্ম করার ধরন দেখে স্কুলের প্রধান শিক্ষক এতটাই চটে গিয়েছিলেন যে, মাঝপথেই অনুষ্ঠানের পর্দা টেনে ডিলানের পারফরম্যান্স বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রধান শিক্ষকের কাছে ডিলানের সেই গানকে অত্যন্ত ‘উগ্র ও অনুপযুক্ত’ মনে হয়েছিল, অথচ কে জানত যে এই ছেলেই একদিন বিশ্ব শাসন করবে!
বিলবোর্ডের শীর্ষে তার কোন গান নেই
যাঁর গান শুনে কোটি মানুষ উদ্বেলিত হয়, যাঁর লেখা ‘লাইক আ রোলিং স্টোন’ বা ‘ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড’-এর মতো গানকে বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাস সেরা তালিকায় রাখে, সেই বব ডিলানের নিজের গাওয়া কোনো একক গান (Single) কখনো আমেরিকার বিখ্যাত ‘বিলবোর্ড ১০০’ চার্টের এক নম্বর স্থান ছুঁতে পারেনি। এটি ডিলানের জীবনের অন্যতম এক চমৎকার ট্রাভিয়া। তার ‘লাইক আ Rolling স্টোন’ ১৯৬৫ সালে এবং ‘রেইনি ডে উইমেন’ ১৯৬৬ সালে বিলবোর্ড চার্টের ২ নম্বর পর্যন্ত গিয়েই আটকে গিয়েছিল। তবে মজার বিষয় হলো, ডিলানের নিজের কণ্ঠের গান এক নম্বরে না গেলেও, তারই লেখা ‘মিস্টার টাম্বুরিন ম্যান’ গানটি যখন বিখ্যাত ব্যান্ড ‘দ্য বার্ডস’ কভার করে গেয়েছিল, তখন সেটি ঠিকই বিলবোর্ডের এক নম্বর শীর্ষ স্থান দখল করে নেয়।
এক টেকেই গান রেকর্ড
বব ডিলানের কাজের ধরন বরাবরই ছিল ভীষণ বৈচিত্র্যময় ও কিছুটা খামখেয়ালি। তার অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘রেইনি ডে উইমেন’ রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে ব্যাকগ্রাউন্ডের মিউজিশিয়ানরা খুব বেশি আড়ষ্ট হয়ে আছেন। স্টুডিওর পরিবেশ হালকা করতে এবং তাদের ভেতরের জড়তা কাটাতে ডিলান তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে মদ্যপান করিয়ে পুরো মাতাল করে দেন এবং সবার হাতের বাদ্যযন্ত্র অদলবদল করে দেন। সেই মাতাল অবস্থাতেই সম্পূর্ণ গানটি মাত্র একবারের চেষ্টায় অর্থাৎ ‘ওয়ান টেক’-এই রেকর্ড করা হয়েছিল, যা আজও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ট্র্যাক হিসেবে গণ্য হয়। এই খামখেয়ালিপনার চূড়ান্ত রূপ বিশ্ববাসী দেখে ২০১৬ সালে, যখন তাকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। নোবেল কমিটি যখন ডিলানকে এই সুখবর দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল, তখন ডিলান সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন এবং ফোন তো ধরেনইনি, বরং পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর প্রায় বেশ কয়েক সপ্তাহ এই বিষয়ে কোনো মন্তব্যই করেননি। পরে অবশ্য তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন এবং প্রমাণ করেন যে, সাধারণ নিয়মের ফ্রেমে বব ডিলানকে কখনো বন্দি করা সম্ভব নয়।