সত্তরের দশকের সাদাকালো টিভির ঝিরঝিরে পর্দা থেকে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিস্ময়কর জগত এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কেবল সময়ের পরিবর্তন নয়, বরং মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম এবং বৈপ্লবিক রূপান্তর। যারা এই পুরো সময়টির সাক্ষী, তারা মূলত দুটি ভিন্ন পৃথিবীর সেতুবন্ধন।
সত্তরের দশকে যাদের জন্ম বা বেড়ে ওঠা, তারা সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভাগ্যবান অথচ বিস্ময়বিমুগ্ধ এক প্রজন্ম। তারা ডায়াল ঘোরানো ল্যান্ডফোনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন, আবার আজ পকেটে থাকা স্মার্টফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলছেন। এই ৫০ বছরে পৃথিবী যতটা বদলেছে, আগের ৫০০ বছরেও হয়তো তা হয়নি।
সাদাকালো শৈশব ও এনালগ নস্টালজিয়া
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বা আশির দশকের শুরুতে বিনোদনের একমাত্র জানালা ছিল সাদাকালো টেলিভিশন। সেই ছাদে উঠে বাঁশ দিয়ে এন্টেনা ঘোরানো, সিগন্যাল ঠিক করার জন্য বুস্টার ব্যবহার আর বিটিভির নির্দিষ্ট সময়ের অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করা ছিল এক অন্যরকম ধৈর্য। টিভির পেছনে বিশাল আকৃতির সেই পিকচার টিউবের জমানা আজ কাঁচের মতো পাতলা স্মার্ট টিভিতে রূপ নিয়েছে। তখনকার টিভিগুলোতে রিমোট কন্ট্রোল ছিল না, চ্যানেল বদলাতে হলে ওঠে গিয়ে টিভির নব ঘুরাতে হতো।
বিনোদনের সঙ্গী ছিল রেডিও আর ক্যাসেট প্লেয়ার। ফিতা পেঁচিয়ে যাওয়া ক্যাসেট থেকে পেন্সিল দিয়ে গান শোনার সেই দিনগুলো আজ রূপকথা মনে হয়। এই সময়ের সবচেয়ে বড় আভিজাত্য ছিল ভিসিআর এবং ভিসিপি। সিনেমা দেখার জন্য বড় বড় প্লাস্টিক বক্সের ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া করে আনা এবং দলবেঁধে ড্রইংরুমে বসে সিনেমা দেখা ছিল এক সামাজিক উৎসব।
দাপ্তরিক কাজে তখন ফ্যাক্স মেশিন ছিল দ্রুত যোগাযোগের সর্বোচ্চ মাধ্যম। আরও পেছনে ফিরে তাকালে মনে পড়ে জরুরি খবরের জন্য পাঠানো সেই টেলিগ্রাম কিংবা এক শহর থেকে অন্য শহরে অপারেটরের মাধ্যমে ট্রাঙ্ক কল বুক করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার স্মৃতি।
ফটোগ্রাফির জন্য ছিল ফিল্মের রিল এবং কোডাক বা ফুজি ক্যামেরার আধিপত্য। ৩৬টি ছবি তোলার পর রিল শেষ হয়ে যেত এবং স্টুডিওতে নেগেটিভ ওয়াশ করতে দিয়ে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হতো। এ ছাড়া পকেটে থাকা ওয়াকম্যান ছিল তখনকার তরুণ প্রজন্মের কাছে আজকের আইফোনের মতোই আভিজাত্যের প্রতীক।
ডিজিটাল বিস্ফোরণ: যখন বিশ্ব হাতের মুঠোয় এলো
নব্বইয়ের দশকে শুরু হলো রূপান্তরের দ্বিতীয় ধাপ। কমপিউটাররের আগমন আর ইন্টারনেটের প্রাথমিক ছোঁয়া পুরো দৃশ্যপট বদলে দিল। তথ্যের আদান-প্রদান হতো মাত্র ১.৪৪ মেগাবাইটের ফ্লপি ডিস্কে; যা পরে সিডি, ডিভিডি এবং পেনড্রাইভে রূপান্তরিত হয়। কমপিউটারগুলো ছিল বিশাল বিশাল বাক্সের মতো, যার শুরুর যুগে পাঞ্চ কার্ড ব্যবহার করা হতো ডেটা প্রসেসিংয়ের জন্য।
এরপর ল্যান্ডফোনের লাইন দখল করে রাখা ডায়াল-আপ ইন্টারনেট সংযোগ আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠা সাইবার ক্যাফে ছিল তথ্যের নতুন স্বর্গ। ব্রাউজারের শুরুতে ছিল নেটস্কেপ নেভিগেটর কিংবা ইয়াহু মেসেঞ্জার-এর রমরমা বাজার। নব্বইয়ের দশকের শেষে নোকিয়ার মতো হ্যান্ডসেটগুলো যখন হাতে এলো, তখন মানুষ প্রথম বুঝল যোগাযোগ কত সহজ হতে পারে। কিন্তু ২০০৭ সালের পর স্মার্টফোন বিপ্লব আমাদের পকেটে আস্ত একটা কমপিউটার ঢুকিয়ে দিল। একসময়ের বিশাল ক্যামেরা, মিউজিক প্লেয়ার, ক্যালকুলেটর, টর্চলাইট এমনকি রাস্তার ম্যাপ সবই একটা ছোট ডিভাইসে বন্দী হয়ে গেল।
ইন্টারনেটের গতি ও সামাজিক পরিবর্তনের জোয়ার
টুজি থেকে আজকের ফাইভজি পর্যন্ত এই যাত্রায় যোগাযোগের সংজ্ঞাটাই বদলে গেছে। একসময় চিঠির উত্তরের জন্য ১৫ দিন অপেক্ষা করা প্রজন্ম এখন সেকেন্ডের ব্যবধানে ভিডিও কলে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যুক্ত। ফেসবুক, ইউটিউব আর ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো তথ্য ও বিনোদনের প্রথাগত কাঠামোকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই সময়ে আমরা দেখেছি তথ্যের বিশাল রূপান্তর।
একসময় কোনও কিছু জানতে হলে লাইব্রেরিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই খুঁজতে হতো বা বিশাল আকারের এনসাইক্লোপিডিয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো, সেই ফিজিক্যাল লাইব্রেরি আজ হাতের মুঠোয় উইকিপিডিয়া ও গুগল সার্চ হয়ে ধরা দিয়েছে। আমরা দেখেছি মুদ্রণ শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন- একসময় সীসার অক্ষর সাজিয়ে লাইনোটাইপ মেশিনে যা ছাপা হতো, আজ তা হচ্ছে ডিজিটাল পাবলিশিংয়ে।
ক্যাশলেস লেনদেনের বিপ্লবে ব্যাংকের লাইনের বদলে মোবাইল ব্যাংকিং জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। প্রযুক্তির এই জোয়ারে মানুষ এখন আর কেবল গ্রহীতা নয়, বরং প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেই চলছে ফ্রিল্যান্সিং আর গ্লোবাল বিজনেস।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজত্ব
বর্তমানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চূড়ায়, যার চালিকাশক্তি হলো এআই। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা মিডজার্নি এখন কেবল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বিষয় নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন কাজের সহযোগী। যে কাজে আগে মাসের পর মাস লাগত, এআই তা করছে কয়েক সেকেন্ডে। এই যুগে আমরা দেখছি জেনারেটিভ এআই-এর ম্যাজিক, যেখানে কেবল নির্দেশ দিলেই তৈরি হচ্ছে ছবি, ভিডিও কিংবা কোডিং।
তথ্য নিরাপত্তার ধারণাও বদলে গেছে; আগে আমরা তালা-চাবি দিয়ে তথ্য রক্ষা করতাম, আর এখন ডিজিটাল বিশ্বে আমাদের সুরক্ষা দেয় এনক্রিপশন ও সাইবার সিকিউরিটি। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের কারণে এখন আর ফিজিক্যাল স্টোরেজের প্রয়োজন নেই, আমাদের সব তথ্য জমা থাকে ভার্চুয়াল জগতে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি হিউম্যানয়েড রোবট থেকে শুরু করে চালকবিহীন গাড়ি সবই এখন বাস্তবতার অংশ। প্রযুক্তির এই উন্নয়ন এখন আর কেবল যান্ত্রিক নয়, তা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে অনুকরণ করতে শুরু করেছে।
সামগ্রিক বিবর্তন ও ইতিহাসের দ্রুততম ট্রান্সফরমেশন
আগেকার যুগে একটি বড় আবিষ্কার হতে শত বছর লাগত। চাকা বা বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর সমাজ স্থিতিশীল হতে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। কিন্তু গত ২০ বছরে আমরা প্রতি বছরই কোনও না কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছি। প্রযুক্তির এই এক্সপোনেনশিয়াল বা সূচকীয় বৃদ্ধি আমাদের জীবনযাত্রাকে যতটা সহজ করেছে, ততটাই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে আমাদের খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতাকে। আমরা সেই প্রজন্ম যারা এনালগ ঘড়িতে সময় দেখা শিখেছি, আবার আজ স্মার্টওয়াচে নিজের হৃদস্পন্দন ও অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ করছি।
যারা সেই ডায়াল ফোন থেকে আজকের এআই যুগ দেখছেন, তারা মূলত দুই পৃথিবীর বাসিন্দা। তারা জানেন ধৈর্যের মূল্য কী, আবার জানেন মুহূর্তের গতির গুরুত্ব। প্রযুক্তির এই বিবর্তন কেবল যন্ত্রের উন্নতি নয়, এটি মানুষের চিন্তাশক্তি আর সম্ভাবনার অসীমতায় পৌঁছানোর এক মহাকাব্য। সামনের দিনগুলোতে প্রযুক্তি আরও কোথায় নিয়ে যাবে তা অনিশ্চিত হলেও, এই প্রজন্মের দেখা রূপান্তরটি মানব ইতিহাসে চিরকাল অনন্য এবং অতুলনীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা কিনলে ডটকম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ই-ক্যাব