নতুন বছরের শুরুতেই কুয়াশার চাদর নিয়ে শীত জেকে বসেছে সর্বত্রই। সকালের ঘন কুয়াশায় যশোরের একটি গ্রামের খেজুর বাগানে রাহুল (ছদ্মনাম) দাঁড়িয়ে আছে। তার কাঁধে বাঁশের সিঁড়ি, হাতে ধারালো দাও আর মাটির কলসি। রাহুলের বয়স চল্লিশের কোঠায় কিন্তু তার চোখে একটা শান্ত দৃঢ়তা। গাছি পেশা তার বংশগত— দাদা, বাবা সবাই খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতেন। শীতের এই সময়ে রসের মৌসুম আর রাহুল প্রতি সকালে গাছে উঠে সেই মিষ্টি রস সংগ্রহ করে। আজও সে গাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে সাবধানে চিরা কেটে রসের ধারা কলসিতে নামাচ্ছে। বাতাসে খেজুরের গন্ধ মিশে যাচ্ছে, পাখিরা ডাকছে। হঠাৎ গ্রামের রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে একটা পুলিশের জিপ এসে থামল। দু’জন অফিসার নেমে এলেন তাদের সঙ্গে কয়েকজন কনস্টেবল। তারা খুঁজছে এক আসামীকে— একটা চুরির মামলায় জড়িত লোক, যে গ্রামে লুকিয়ে আছে বলে খবর পেয়েছে। গ্রামবাসীরা ভয়ে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে। পুলিশের চোখ পড়ল বাগানে রাহুলের উপর। একজন ইন্সপেক্টর এগিয়ে এলেন, ‘এই লোক, তুমি কে? এখানে কী করছ? কোনো সন্দেহজনক লোক দেখেছ কি?’
রাহুল গাছ থেকে নেমে এল তার চোখে কোনো ভয় নেই। সে শান্ত গলায় বলল, কিন্তু ইংরেজিতে: ‘Officer, I am merely tending to my ancestral craft, extracting sap from these date palms. As for your suspect, I have seen no one fitting that description. Perhaps you should direct your inquiries elsewhere, lest you disrupt the harmony of this village without cause.’ পুলিশ অফিসার অবাক হয়ে গেলেন। এই গ্রাম্য গাছি এমন সাবলীল ইংরেজিতে কথা বলছে? কড়া জবাবে তারা থমকে গেল কিন্তু রাহুলের দৃঢ়তায় আর প্রশ্ন করল না। তারা চলে গেল অন্যদিকে।
রাহুলের আসল পরিচয় পুলিশ জানে না— সে শহরের একটা নামকরা কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের প্রফেসর, ব্রিলিয়ান্ট শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। ছুটিতে গ্রামে ফিরে এসে সে তার বংশের পেশা পালন করে, গাছের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। এটি তার জন্য শান্তি, তার শিক্ষকতার চাপ থেকে মুক্তি। পুলিশ চলে যাওয়ার পর রাহুল আবার গাছে উঠল, রসের ধারা দেখে হাসল। জীবন তার কাছে দু’টো দুনিয়ার মিশেল— একটা বইয়ের পাতায়, অন্যটা খেজুরের গাছে। গ্রামের লোকেরা তাকে গাছি বলে ডাকে কিন্তু তার মনে সে একজন যোদ্ধা, যে তার ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছে।
বাংলায় ‘গাছি’ শব্দটি সাধারণত খেজুর বা তাল গাছ থেকে রস সংগ্রহকারী ব্যক্তিকে বোঝায় যা ইংরেজিতে ‘toddy tapper’ নামে পরিচিত। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা যেখানে ব্যক্তি গাছে চড়ে স্যাপ (রস) সংগ্রহ করে, যা পরে মিষ্টি রস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পেশা ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় প্রচলিত এবং এটি প্রায়শই নির্দিষ্ট জাতি বা সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত। গাছিরা একটি পেশাজীবী শ্রেণি যাদের কাজ গাছের যত্ন নেওয়া, রস তোলা এবং সেই রস থেকে গুড় বা পাটালি তৈরি করা। এটি শীতকালীন একটি মৌসুমি পেশা যা গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিছু এলাকায় গাছিদের পাশি বা শিউলি নামেও ডাকা হয়।
গাছি পেশার উৎপত্তি প্রাচীনকাল থেকে। গ্রামীণ বাংলায় শতাব্দী ধরে এই পেশা চলে আসছে যা খেজুর রস থেকে গুড়, পাটালি এবং রসের পিঠা তৈরির সাথে যুক্ত। বাংলাপিডিয়া অনুসারে, গাছিরা গাছের শীর্ষভাগ কেটে (V-আকৃতির কাটা) বাঁশের নল দিয়ে রস সংগ্রহ করেন। এটি একটি দক্ষতাপূর্ণ কাজ যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়ের মতো বিখ্যাত গুড়ের ঐতিহ্যে গাছিদের ভূমিকা অপরিহার্য। এই গুড়ের ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো বলে উল্লেখ আছে। গ্রামবাংলার লোককথা এবং সংস্কৃতিতে গাছিরা শীতের আগমনের প্রতীক। একসময় এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি ঐতিহ্যবাহী অংশ ছিল।
গাছি পেশা যশোরের ঐতিহ্যবাহী পেশা এবং জেলার ব্র্যান্ডিংয়ের একটি বড় অংশ। প্রবাদ আছে ‘যশোরের যশ খেজুরের রস’। যশোরের খেজুরের গুড় দেশ-বিদেশে বিখ্যাত তার স্বাদ, ঘ্রাণ এবং খাঁটিত্বের জন্য। এটি বাংলাদেশের জিআই (Geographical Indication) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত (বাংলাদেশের ২২তম জিআই পণ্য)। এ জেলায় প্রায় ৫ লাখ খেজুরগাছ রয়েছে। প্রতি বছর ৩০০০-৩৫০০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হয়, যার একটি বড় অংশ রপ্তানি হয়। জেলায় ৬ হাজারের বেশি গাছি এ পেশায় নিয়োজিত। এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি এবং শতকোটি টাকার ব্যবসা। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু উপযোগী যশোরের খাজুরা, বাঘাপাড়া, চৌগাছা, মাগুরার শালিখার খেজুরের রস সুগন্ধি ও সুস্বাদু হয়ে থাকে। এই অঞ্চলের মাটি সাধারণত বেলে দো-আঁশ। আর পানিতে লবণাক্ততা নেই। ফলে গাছের শিকড় অনেক নিচে পর্যন্ত যেতে পারে।
১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতা দখলের পর দলে দলে সাহেব বিলেত থেকে এ দেশে আসতে থাকে। মি. বালকে নামে এক সাহেব চিনি তৈরির ব্যবসায়ে নামেন। যশোর থেকে খেজুরের গুড় নিয়ে চিনি তৈরি শুরু করেন। খরচ বেশি পড়ায় তিনি ধোবাও সুগার কোম্পানি গঠন করে। কোটচাঁদপুর ও ত্রিমোহনীতে দুটি বড় চিনি ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। ১৮৮২ সাল পর্যন্ত সাহেবের কারখানা দুটো ভালো চলে। যশোর ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে বর্ণিত তথ্যে জানা যায়, ১৮৪২ সালে কলকাতায় বসবাসরত সাহেবগণ গ্যাডস্টোন অ্যান্ড কোম্পানি গঠন করে চিনি ব্যবসায়ে নামেন। এ ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন মি. স্মিথ নামে এক বিলেতি। পরে ম্যাকলিউড নামে আরেক সাহেব ম্যানেজার হন। ম্যাকলিউড পরিবারের অনেক স্মৃতি এখনো কোটচাঁদপুরে আছে। কোটচাঁদপুর ছাড়াও ঝিকরগাছা, ত্রিমোহনী, চৌগাছা, নারকেলবাড়িয়াতে এ কোম্পানির আরো চিনি ফ্যাক্টরি ছিল। ১৮৫৩ সালে মি. নিউ হাউজ তাহেরপুরে একটি বড় আকারের ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। তিন- চার বছর চলার পর লোকসান শুরু হয়। মি. এলএসএস ওম্যালি কর্তৃক প্রকাশিত যশোর ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, সাহেবদের চেয়ে দেশীয় ময়রাদের কারখানায় উৎপাদিত চিনির মান ভালো থাকায় চাহিদাও বেশি ছিল। আখ থেকে উৎপাদিত সাদা চিনির আমদানি শুরু হলে খেজুর গুড় হতে তৈরি চিনি শিল্পে বিপর্যয় ঘটে। ১৮৯০-এর পর যশোর অঞ্চলে গড়ে উঠা দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি চিনি বাজার হারায়। ১৯৫০ সালেও কয়েকটি কালের সাক্ষী হিসেবে টিকে ছিল। পরে এগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। খান বাহাদুর এম এ মোমেন ফাইনাল রিপোর্ট অন দি সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট অব যশোর বইতে লিখেছেন, ১৯০৮ সালের দিকে যশোর অঞ্চলে ৬০ লাখ খেজুরগাছ ছিল। এ গাছ থেকে ২৫ লাখ মণ গুড় তৈরি হতো। অবশ্য এ সময়ে খেজুর থেকে চিনি তৈরি প্রায় উঠে গিয়েছিল।
গাছি পেশা একটি দক্ষতা-নির্ভর পেশা। গাছিরা গাছে উঠে কাজ করেন তাই শারীরিক সক্ষমতা, সাহস এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ঐতিহ্যগতভাবে এ পেশা পিতা থেকে পুত্রে চলে আসে। রস বিক্রি বা গুড় তৈরি করে গাছ মালিকের সাথে ভাগাভাগি করে আয় করেন। একসময় এটি লাভজনক ছিল, কিন্তু এখন কমে গেছে। প্রতিটি খেজুরের স্বাদ মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির যত্ন আর আমাদের সংরক্ষণই রাখে এই সৌন্দর্য় অক্ষয় ও জীবন্ত।
বর্তমান অবস্থায় গাছি পেশা হারিয়ে যাওয়ার পথে। খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় (ইটভাটা, উন্নয়ন কাজ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে) এ পেশা বিপন্ন। নতুন প্রজন্ম আগ্রহ হারাচ্ছে তারা অন্য পেশায় (যেমন দিনমজুরি, রিকশা চালানো) চলে যাচ্ছে। গ্রামে গ্রামে একসময় ৮-১০ জন গাছি থাকলেও এখন কয়েক গ্রাম মিলে একজনও পাওয়া যায় না। তবে সরকার ও স্থানীয় উদ্যোগে প্রশিক্ষণ এবং মেলার মাধ্যমে এটি রক্ষার চেষ্টা চলছে। এ পেশায় তরুণদের আগ্রহ বাড়াতে প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এ পেশা ঐতিহ্যবাহী। এটি শুধু একটি পেশা নয়,এটি গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা