ডাইনোসরের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে টি-রেক্সের সেই বিশাল হাঁ বা ট্রাইসেরাটপসের শক্তিশালী শিং। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে এমন এক ‘অতিথি’ মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এসেছিল, যে পুরো পৃথিবীর ইতিহাসটাই বদলে দিয়েছিল।
চলুন জেনে নিই সেই মহাপ্রলয় আর আমাদের দুর্ভাগা (নাকি সৌভাগ্যবান?) ডাইনোসর বন্ধুদের বিদায়ঘণ্টা বাজানো চিকক্সুলুব (Chicxulub) উল্কাপিন্ডের গল্প!
যখন আকাশ ভেঙে পড়ল!
কল্পনা করুন, একটি রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। ডাইনোসররা মনের সুখে চরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ আকাশে দেখা গেল সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল কিছু একটা। সেটা কোনো তারা ছিল না, ছিল প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার চওড়া এক দানবীয় পাথর— চিকক্সুলুব উল্কাপিন্ড।
এটি বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে আছড়ে পড়েছিল। এর গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৬৪,০০০ কিলোমিটার! অর্থাৎ, চোখের পলক ফেলার আগেই সব শেষ।
বিস্ফোরণটা কেমন ছিল?
যদি ভাবেন এটা সাধারণ কোনো বাজি ফোটানোর মতো ছিল, তবে ভুল করবেন। চিকক্সুলুবের আঘাতের শক্তি ছিল হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী!
বিশাল গর্ত: এই আছড়ে পড়ার ফলে পৃথিবীতে ১৫০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২০ কিলোমিটার গভীর এক গর্ত তৈরি হয়েছিল।
সুনামি: সমুদ্রের জলরাশি আকাশছোঁয়া পাহাড়ের মতো (প্রায় কয়েকশ মিটার উঁচু) হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আগুনের বৃষ্টি: ঘর্ষণের ফলে বায়ুমণ্ডল এতটাই উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিল যে আকাশ থেকে জ্বলন্ত পাথরের টুকরো বৃষ্টির মতো পড়তে শুরু করে।
ডাইনোসরদের জন্য কেন এটা ‘ব্যাড লাক’ ছিল?
মজার ব্যাপার হলো, উল্কাপিন্ডটি যদি সমুদ্রের একটু গভীর অংশে বা অন্য কোথাও পড়ত, তবে হয়তো ডাইনোসররা বেঁচে যেত। কিন্তু এটি পড়েছিল এমন এক জায়গায় যেখানে সালফার বা গন্ধক প্রচুর ছিল।
আঘাতের ফলে প্রচুর পরিমাণে ধুলো আর সালফার বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলাফল? ‘ইমপ্যাক্ট উইন্টার’ বা কৃত্রিম শীতকাল। সূর্যের আলো বছরের পর বছর পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারেনি। গাছপালা মরে গেল, খাবার ফুরিয়ে এল, আর এভাবেই ডাইনোসর সাম্রাজ্যের পতন ঘটল।
ছোটরা প্রানীরা বেঁচে গেল
এই প্রলয়ে কিন্তু সব প্রাণী মারা যায়নি। ডাইনোসরদের মধ্যে যারা উড়তে পারত (যাদের থেকে আজকের পাখি এসেছে) তারা কোনোমতে টিকে গিয়েছিল। আর আমাদের পূর্বপুরুষ, অর্থাৎ ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা মাটির নিচে গর্ত করে লুকিয়ে থেকে এই মহাবিপদ কাটিয়ে দিয়েছিল। ডাইনোসররা বিদায় নিল বলেই কিন্তু পরে মানুষেরা পৃথিবীর দখল নিতে পেরেছে!
কিছু মজার তথ্য (Fun Facts)
নামের মাহাত্ম্য: ‘চিকক্সুলুব’ নামটি এসেছে মায়া ভাষা থেকে, যার অর্থ হলো ‘শয়তানের লেজ’। জায়গাটির নাম থেকেই উল্কাপিন্ডটির নামকরণ করা হয়েছে।
গোল্ডেন শট: বিজ্ঞানীরা বলেন, উল্কাপিন্ডটি যদি মাত্র ৩০ সেকেন্ড আগে বা পরে পড়ত, তবে সেটি আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ত এবং ডাইনোসররা হয়তো আজও পৃথিবীতে রাজত্ব করত!
ডাস্ট ক্লাউড: বিস্ফোরণের ধুলোবালি এত বেশি ছিল যে পৃথিবী প্রায় ১০ বছর অন্ধকারের চাদরে ঢাকা ছিল।
কিভাবে খোজ মিললো চিকশুলুবের?
চিকশুলুব (Chicxulub) গ্রহাণুর আঘাতের ফলে ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটেছিল—এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর একটি গোয়েন্দা কাহিনীর মতো। নিচে ছোট করে এর মূল রহস্য ও প্রমাণগুলো দেওয়া হলো:
১৯৮০ সাল- মাটির নিচের ভিনগ্রহী ধুলো _
১৯৮০ সালে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার আলভারেজ ইতালির পাহাড়ে গবেষণার সময় ৬৬ কোটি বছর পুরনো পাথরের স্তরে প্রচুর পরিমাণে ইরিডিয়াম খুঁজে পান। এই ধাতু পৃথিবীতে বিরল হলেও মহাকাশের উল্কাপিণ্ডে থাকে প্রচুর। তখনই তিনি দাবি করেন—ডাইনোসরদের কোনো মহাকাশীয় পাথরই মেরেছে!
১৯৯১- নিখোঁজ গর্তের সন্ধান _
বিজ্ঞানীরা মহাকাশীয় পাথরের প্রমাণ পেলেও সেই বিশাল গর্ত (Crater) খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ১৯৯১ সালে মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে মাটির নিচে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার চওড়া এক দানবীয় গর্তের সন্ধান মেলে। তেল তুলতে গিয়ে ভূ-বিজ্ঞানীরা এটি আগে দেখলেও তারা জানতেন না এটিই সেই ডাইনোসর মারার ‘স্মোকিং গান’।
অকাট্য প্রমাণ: ‘শকড কোয়ার্টজ’ _
চিকশুলুব এলাকায় ড্রিলিং করে পাওয়া যায় শকড কোয়ার্টজ। এই পাথর কেবল তখনই তৈরি হয় যখন পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী কোনো আঘাত লাগে। এটি প্রমাণ করে, সেখানে ১০ বিলিয়ন হিরোশিমা পারমাণবিক বোমার সমান শক্তি নিয়ে গ্রহাণুটি আছড়ে পড়েছিল।
২০১৯- টাটকা জীবাশ্মের ডায়েরি (টানিস সাইট) _
২০১৯ সালে নর্থ ডাকোটায় এমন কিছু মাছের ফসিল পাওয়া যায়, যাদের ফুলকায় গ্রহাণুর আঘাতে ছিটকে আসা কাঁচের কণা আটকে ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, আঘাতের ঠিক কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশাল সুনামিতে মাছগুলো ডাঙ্গায় আছড়ে পড়েছিল।
মজার তথ্য: গ্রহাণুটির আকার ছিল মাউন্ট এভারেস্টের সমান এবং এর পতনের ফলে কয়েক হাজার মাইল পর্যন্ত কয়েক সেকেন্ডে সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
আবার এমন উল্কাপিন্ড যদি আসে?
ডাইনোসরদের বিলুপ্ত করেছিল যে উল্কাপিণ্ড (বা গ্রহাণু), সেটির নাম ছিল চিকশুলুব (Chicxulub)। এটি প্রায় ১০ কিলোমিটার চওড়া ছিল।
বর্তমানে যদি এমন কোনো বিপদ আসে, তবে নাসা (NASA) প্রস্তুত আছে।
বর্তমানে নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো কেবল বসে নেই। তারা এ ধরনের মহাজাগতিক বিপদ ঠেকাতে বেশ কিছু শক্তিশালী পদক্ষেপ নিয়েছে:
১. ডিএআরটি (DART) মিশন: মহাকাশে সফল পরীক্ষা
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাসা DART (Double Asteroid Redirection Test) নামক একটি সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। তারা একটি মহাকাশযানকে তীব্র গতিতে একটি গ্রহাণুর গায়ে ধাক্কা দিয়ে তার কক্ষপথ সামান্য পরিবর্তন করে দিয়েছে।
শিক্ষা: আমরা এখন জানি যে, কোনো বড় পাথর পৃথিবীর দিকে আসার আগেই যদি মহাকাশযান দিয়ে ধাক্কা দেওয়া যায়, তবে তার পথ বদলে দেওয়া সম্ভব।
২. গ্রহাণু ট্র্যাকিং (Planetary Defense)
নাসা নিরন্তর মহাকাশে নজরদারি চালায়। তাদের মতে:
আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বড় ধরনের কোনো উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে আঘাত করার সম্ভাবনা নেই।
নাসা Near-Earth Objects (NEO) প্রোগ্রামের মাধ্যমে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকা বড় পাথরগুলোর ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখে।
শেষ কথা
ডাইনোসরদের সময়ে কোনো প্রযুক্তি ছিল না, কিন্তু আমাদের আছে। নাসা এখন ছোট ও মাঝারি আকারের গ্রহাণু ঠেকাতে সক্ষম, তবে খুব বড় গ্রহাণুর ক্ষেত্রে আমাদের আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন।