১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণার চিরাচরিত ধরনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার চিরচেনা পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল প্রচারণা এখন প্রার্থীদের জন্য এক অনন্য শক্তিশালী হাতিয়ার। ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের এই প্রিয় বাংলাদেশে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮ কোটি ছাড়িয়েছে, সেখানে ডিজিটাল প্রচারণা আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং জনগণের রায় পাওয়ার অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য মতে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ২৯ হাজার ৪২ জন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এবার ৪৫ লাখ ৭১ হাজার ২১৬ জন নতুন প্রাণবন্ত তরুণের অন্তর্ভুক্তি এবং মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ তরুণ (১৮-৩৭ বছর বয়সী) হওয়ায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই হয়ে ওঠেছে আগামীর জনমত গড়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
ভোটারদের কতটা কাছাকাছি নিতে পারে ডিজিটাল প্রচারণা?
বর্তমান ডিজিটাল মাধ্যম প্রার্থীদের জন্য এক বিশাল ‘ভার্চুয়াল উঠান বৈঠক’ হিসেবে কাজ করছে। ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে একজন প্রার্থী মুহূর্তের মধ্যেই তার নির্বাচনী এলাকার লাখও মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে যাচ্ছেন।
ব্যক্তিগত সংযোগ ও এআই ভয়েস ক্লোনিং: প্রার্থীরা এখন এআই-চালিত চ্যাটবটের মাধ্যমে ভোটারদের নানা কৌতূহলের উত্তর দিচ্ছেন। প্রার্থীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর এআই দিয়ে ক্লোন করে হাজার হাজার ভোটারকে সরাসরি ফোন দেয়া সম্ভব হচ্ছে, যেখানে প্রার্থী সশরীরে উপস্থিত না থেকেও ভোটারের নাম ধরে সালাম জানিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন।
পার্সোনালাইজড ভিডিও বার্তা: সিনথেসিস বা হাইজেন এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রার্থীরা প্রতিটি ভোটারের নাম নিয়ে পৃথক ভিডিও বার্তা পাঠাতে পারেন, যা ভোটারের হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা তৈরি করে।
ভৌগোলিক সীমানা জয়: এবারই প্রথম প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ থাকায় বিদেশের মাটিতে থাকা ৭ লাখ ৬০ হাজারের বেশি ভোটারের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র কার্যকর সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ডিজিটাল প্রচারণা।
নির্বাচনী ইশতেহার ও এআই-এর ভূমিকা
একজন দূরদর্শী প্রার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা ইশতেহার তৈরিতে এআই এখন অত্যন্ত কার্যকর সহায়ক।
ডেটা বিশ্লেষণ ও হাইপার-লোকাল টার্গেটিং: এআই ব্যবহারের মাধ্যমে একটি পাড়ার অতি নির্দিষ্ট সমস্যা (যেমন পানীয় জলের সংকট) সমাধানের সুনির্দিষ্ট বার্তা শুধু ওই এলাকার ভোটারের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
ইন্টারঅ্যাক্টিভ ইশতেহার ও ভবিষ্যৎ দর্শন: ভোটাররা যখন কিউআর কোড স্ক্যান করবেন, তখন প্রার্থীর এআই অবতার সরাসরি তাদের প্রশ্নের জবাব দেবে। এ ছাড়াও ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে ভোটারদের প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সরাসরি দেখার এক ‘৩৬০-ডিগ্রি ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা’ প্রদান করা যেতে পারে।
ভোটাররা কেনই বা তাদের ভোট দেবেন?
আধুনিক এই সময়ের ভোটাররা প্রার্থীর কেবল দল নয়, বরং তার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেও সমান গুরুত্ব দেন।
স্বচ্ছতা ও সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস: এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে প্রতি মুহূর্তের জনমতের পালস বা ‘সেন্টিমেন্ট’ বোঝা যাচ্ছে। যদি কোথাও কোনও ভুল বোঝাবুঝি হয়, তবে প্রার্থী তাৎক্ষণিকভাবে তা দূর করার সুযোগ পাচ্ছেন।
সরাসরি জবাবদিহিতা: স্মার্ট নির্বাচনী চ্যাটবট ব্যবহারের ফলে সাধারণ ভোটাররা প্রার্থীর ইশতেহার নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারছেন, যা প্রতিটি ভোটারকে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবতে শেখাচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ
নির্বাচনী অর্থনীতিতেও এই ডিজিটাল বিপ্লব এক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
সাশ্রয়ী প্রচারণা ও জিও-ফেন্সিং: বিশাল জনসভা বা হাজারও পোস্টার ছাপানোর চেয়ে ডিজিটাল বুস্টিং অনেক বেশি সাশ্রয়ী। জিও-ফেন্সিং টেকনোলজি ব্যবহার করে কোনও ভোটার যখন নির্দিষ্ট বাজার বা জনবহুল স্থানে প্রবেশ করবেন, তখনই তার ফোনে প্রার্থীর উন্নয়ন পরিকল্পনার নোটিফিকেশন পৌঁছে যাবে।
ভোটার টার্নআউট প্রেডিকশন: এআই বিশ্লেষণ করে আগেভাগেই বোঝা সম্ভব কোন কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি কম হতে পারে, ফলে প্রার্থী সেখানে শেষ মুহূর্তে বাড়তি প্রচারণা চালাতে পারেন।
আধুনিক বিশ্বে এআই ও যুগান্তকারী প্রচারণা কৌশল
এআই কমান্ড সেন্টার: একটি রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড যা প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পদক্ষেপ ও অনলাইনে ছড়ানো গুজব মুহূর্তেই শনাক্ত করে প্রার্থীকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
অগমেন্টেড রিয়েলিটি ও গ্যামিফিকেশন: প্রার্থীর পোস্টারের ওপর ফোন ধরলে উন্নয়নের থ্রিডি দৃশ্য জীবন্ত হয়ে ওঠা এবং তরুণদের জন্য শিক্ষামূলক মোবাইল গেম প্রচারণাকে দারুণ আকর্ষণীয় করে তুলবে।
গুজব প্রতিরোধ: ডিপফেক মোকাবিলায় এআই-ভিত্তিক ‘ফ্যাক্ট চেক’ এবং প্রতিটি ভিডিওতে ‘ডিজিটাল সিল’ বা ওয়াটারমার্ক ব্যবহার করে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
তথ্যপ্রযুক্তি এখন আর কেবল প্রচারের মাধ্যম নয়, এটি জনগণের চাহিদা বুঝে সঠিক সমাধান দেয়ার এক বৈঞ্চানিক সেতুবন্ধন। প্রার্থী যদি এই এআই টুলসগুলো সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার করেন, তবে তিনি কেবল একজন প্রার্থী নন, বরং জনগণের কাছে একজন ‘স্মার্ট অভিভাবক’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে যে প্রার্থী প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হৃদস্পন্দন বুঝতে পারবেন, জয়ের গৌরব সম্ভবত তিনিই অর্জন করবেন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা কিনলে ডটকম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ই-ক্যাব