চ্যানেল আইল্যান্ডসের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত অলডার্নি দ্বীপটি দেখলে যে কারো মনে হতে পারে এটি প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ। আটলান্টিকের নীল জলরাশি আর দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহে ঘেরা এই শান্ত দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে যেন এক স্বর্গ। কিন্তু এই শান্ত রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এক ভয়ংকর এবং বিষাদময় অধ্যায়। ব্রিটিশ ভূখণ্ডের এই অংশটি একসময় পরিণত হয়েছিল নাৎসিদের নৃশংসতার এক নির্মম সাক্ষী হিসেবে, যা অনেকের কাছে পরিচিত ‘পৃথিবীর নরক’ নামে।
একটি পরিত্যক্ত দ্বীপের বন্দিদশা
১৯৪০ সালের জুন মাসে যখন নাৎসি বাহিনী চ্যানেল আইল্যান্ডসের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন ব্রিটিশ সরকার অলডার্নি দ্বীপের প্রায় সকল বাসিন্দাকে সরিয়ে নেয়। জনমানবহীন এই দ্বীপটি দ্রুত জার্মানদের দখলে চলে যায়। হিটলারের লক্ষ্য ছিল অলডার্নিকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা, যাতে মিত্রবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। এই বিশালাকার নির্মাণযজ্ঞ চালানোর জন্য নাৎসিরা দ্বীপটিতে চারটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প স্থাপন করে, যাদের নামকরণ করা হয়েছিল বিখ্যাত চার জার্মান কবির নামে নর্ডানি, হেলগোল্যান্ড, বোর্কুম এবং সিল্ট।
ব্রিটিশ মাটিতে একমাত্র নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প
অলডার্নির এই ক্যাম্পগুলো ছিল ব্রিটিশ ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। সিল্ট ক্যাম্পটিকে ১৯৪৩ সালে সরাসরি এসএস (SS) বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনা হয়, যা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মর্যাদা দেয়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড এবং ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার বন্দীকে এখানে নিয়ে আসা হয়। এদের মধ্যে যেমন ছিল যুদ্ধবন্দী, তেমনি ছিল সাধারণ ইহুদি নাগরিক। ব্রিটিশ মাটি হওয়া সত্ত্বেও এখানে চলেছিল থার্ড রাইখের নিজস্ব শাসন এবং সীমাহীন নির্যাতন।
রক্ত আর ঘামে গড়া আটলান্টিক ওয়াল
এই বন্দীদের মূল কাজ ছিল হিটলারের ‘আটলান্টিক ওয়াল’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিশাল সব বাঙ্কার, সুড়ঙ্গ এবং পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা। পাথুরে মাটিতে হাত দিয়ে বিশাল সব কংক্রিটের কাঠামো গড়ার কাজটি ছিল অমানবিক। তীব্র ঠান্ডা, অপুষ্টি আর দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে বন্দীরা কঙ্কালসার হয়ে পড়ত। যদি কেউ ক্লান্ত হয়ে কাজ থামাতে চাইত, তবে তাকে জুটত চাবুকের আঘাত অথবা সরাসরি মৃত্যুদণ্ড। দ্বীপের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা বিশাল সব বাঙ্কারগুলো আজও সেই দাসত্বের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
মৃত্যুর দ্বীপ ও নির্মম গোপনীয়তা
অলডার্নিতে ঠিক কতজন বন্দী মারা গিয়েছিলেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান আজও বিতর্কের বিষয়। সরকারি হিসেবে সংখ্যাটি কয়েকশ হলেও ইতিহাসবিদদের মতে এই সংখ্যাটি কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। বন্দীদের ওপর চালানো নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, একে ‘মৃত্যুর মাধ্যমে বিনাশ’ বা ‘এক্সটারমিনেশন থ্রু লেবার’ বলা হতো। অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ বন্দীদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো অথবা বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হতো। যুদ্ধের শেষে নাৎসিরা তাদের অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য অনেক গণকবর ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলেছিল।
অলডার্নি মিউজিয়াম ও আধুনিক গবেষণা
দ্বীপের মূল শহরে অবস্থিত অলডার্নি মিউজিয়ামে এই অন্ধকার সময়ের অনেক নথি, ছবি এবং বন্দীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে। সম্প্রতি আর্কিওলজিস্টরা অত্যাধুনিক ‘লিডার’ (LiDAR) প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির নিচে থাকা গণকবর এবং সুড়ঙ্গগুলোর মানচিত্র তৈরি করছেন। ব্রিটিশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক গবেষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই দ্বীপের সঠিক ইতিহাস উদ্ঘাটনে, যাতে সেই সময়কার ভিকটিমদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের পরিচয় বিশ্বের সামনে আনা যায়।
অলডার্নির সেই নারকীয় পরিস্থিতি থেকে বেঁচে ফেরা কয়েকজন বন্দীর জবানবন্দি এবং ডায়েরি থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।
জার্মান নৌবাহিনীর ড্রাফটসম্যান উইলহেম ওয়েরনেকে তার গোপন নোটে উল্লেখ করেন, ‘‘বন্দীদের খাবার ছিল পচা রুটি ও পাতলা স্যুপ; ক্ষুধায় তারা ময়লা ও বুনো ঘাস খেত। ’’
স্প্যানিশ বন্দী ফ্রান্সিসকো ফনসেকা জানান, ‘‘এসএস গার্ডরা বন্দীদের ওপর কুকুর লেলিয়ে দিত এবং অমানবিক নির্যাতন চালাত; তার ভাষায়, সেখানে ‘মৃত্যুই ছিল একমাত্র মুক্তি’।’’
পোলিশ বন্দী সিলভেস্টার জুব্রজিকি সাক্ষ্যে বলেন, ‘‘অসুস্থদের চিকিৎসা ছিল না, অনেকের দাঁতের সোনা তুলে নিয়ে গণকবরে ফেলা হতো, আর তীব্র শীতে বহু বন্দী জমে মারা যেত। ’’
সৌন্দর্য আর শোকের অদ্ভুত সহাবস্থান
বর্তমান অলডার্নি তার সেই অন্ধকার অতীতকে পেছনে ফেলে আবার শান্ত হয়ে উঠেছে। পর্যটকরা এখানে আসেন এর চমৎকার সৈকত আর ঐতিহাসিক দুর্গগুলো দেখতে। তবে দ্বীপের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষগুলো এখনো ফিসফিস করে সেই সব নাম না জানা বন্দীদের আর্তনাদ শোনায়। এটি এখন কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন আর যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। ব্রিটিশ ভূখণ্ডের এই এক চিলতে মাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, চরম সৌন্দর্যের আড়ালেও কখনো কখনো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বীভৎস অধ্যায়গুলো চাপা পড়ে থাকে।
আজকের অলডার্নিতে গেলে আপনি সেই কুখ্যাত সিল্ট (Sylt) ক্যাম্পের প্রবেশপথের পাথরের স্তম্ভগুলো এখনও দেখতে পাবেন। এটিই ছিল দ্বীপের সবচেয়ে কঠোর ক্যাম্প। বর্তমানে সেখানে একটি স্মৃতিফলক বসানো হয়েছে, যা পর্যটক এবং ইতিহাসপ্রেমীদের সেই বন্দীদের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে ক্যাম্পের ভেতরের অধিকাংশ কাঠামো যুদ্ধের পরপরই নাৎসিরা ধ্বংস করে দিয়েছিল প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য। ক্যাম্পের ঠিক পাশেই রয়েছে বর্তমানের অলডার্নি বিমানবন্দর, যার রানওয়ের নিচেই অনেক বন্দীর রক্ত আর পরিশ্রম মিশে আছে বলে ধারণা করা হয়।