আজ পহেলা ফাল্গুন—ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম সকাল। শীতের দীর্ঘ ক্লান্তি পেছনে ফেলে প্রকৃতি আজ নতুন করে হাসে। কুয়াশার আবরণ সরে গিয়ে বাতাসে ভেসে আসে মধুর ঘ্রাণ, ফুলের নরম ডাক, আর মানুষের হৃদয়ের ভেতর জেগে ওঠে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। প্রকৃতি আর মানুষের মেলবন্ধনে বসন্ত যেন কেবল একটি ঋতু নয়— এটি অনুভবের উৎসব।
পহেলা ফাল্গুন মানেই ঢাকার এক বিশেষ ঠিকানা— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর চারুকলা অনুষদ। ১৯৯১ সাল থেকে চারুকলার শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসবের রঙিন যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে চারুকলার প্রাঙ্গণ বসন্তের প্রাণকেন্দ্র— রঙ, গান, মুখোশ, আলপনা আর মানুষের হাসিতে মুখর এক মিলনমেলা।
আজ বাসন্তী রঙের শাড়িতে রঙিন তরুণীরা যেন হলুদের আলোয় মোড়া বসন্ত নিজেই। খোপায় গাঁদা ফুলের মালা, কপালে আলপনা, চোখে অপেক্ষার দীর্ঘ এক বছরের গল্প। তরুণদের কণ্ঠে গান, পায়ে পায়ে ছন্দ— সব মিলিয়ে চারুকলার পথ ধরে হাঁটা মানেই এক ধরনের আবেগী ভ্রমণ। এই দিনটার জন্যই তো সারা বছর ধরে বুকের ভেতর জমে থাকে রোদ্দুর, জমে থাকে গান, জমে থাকে না-বলা ভালোবাসা।
বসন্তের এই উৎসবে প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে সংস্কৃতির গভীর সুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর গানে বসন্ত আসে নীরব মাধুর্যে, আর শাহ আব্দুল করিম-এর সুরে বসন্ত হয়ে ওঠে লোকজ প্রাণের স্পন্দন। গান আর কবিতার হাত ধরে বসন্ত আজ হৃদয়ে হৃদয়ে ভ্রমণ করে।
তবে এই ফাল্গুন শুধু রঙ আর প্রেমের নয়— এই ফাগুন দ্রোহেরও। শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙ মনে করিয়ে দেয় ভাষা আন্দোলনের রক্তিম ইতিহাস। রফিক, সালাম, বরকত, সফিক— এই নামগুলো বসন্তের বাতাসে আজও লেখা থাকে আত্মত্যাগের অক্ষরে। তাই বসন্ত মানে কেবল ফুল ফোটা নয়; বসন্ত মানে চেতনা, বসন্ত মানে নতুন করে জেগে ওঠা।
এখন বসন্ত শুধু চারুকলা বা রাজপথে নয়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বসন্ত। কেউ যুগলে উদযাপন করছে, কেউ একলা বসন্তে রসিকতা ছড়াচ্ছে। তবু সবার হৃদয়ের ঠিক একই জায়গায় একটাই শব্দ— ফাল্গুন।
আজ পহেলা ফাল্গুন। ভালোবাসার রঙে, সংস্কৃতির সুরে আর ইতিহাসের গৌরবে— বাঙালির বসন্তবরণ।