ফাল্গুনের প্রথম প্রহরে যখন শিমুল আর পলাশের রাঙা হাসিতে প্রকৃতি সেজে ওঠে, ঠিক তখনই ক্যালেন্ডারের পাতায় আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন ‘১৪ ফেব্রুয়ারি’। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইনস ডে। একমুঠো বসন্তের রোদ আর এক বুক আবেগ নিয়ে এই দিনটি আসে কেবল দুটি হৃদয়ের একান্ত আলাপন হতে। নাগরিক জীবনের ধুলোবালি আর যান্ত্রিকতার কঠোর আবরণ ভেদ করে এই দিনটিতে মানুষ আবার নতুন করে প্রেমে পড়ে, নতুন করে ভালোবাসার শপথ নেয়। প্রিন্ট মিডিয়ার পাতায় যখন আমরা ভালোবাসার গল্প বুনি, তখন দেখা যায় এই একটি দিনকে ঘিরে কত শত প্রতীক্ষা, কত সহস্র স্বপ্নের আনাগোনা। এটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং হৃদয়ের গহীনে জমানো কথাগুলো প্রিয়জনের কানে পৌঁছে দেওয়ার একটি ঋতু।
ফাগুনের আগুন ও ভালোবাসার বর্ণিল ক্যানভাস
ভালোবাসার কোনো সুনির্দিষ্ট ঋতু নেই সত্যি, কিন্তু বসন্তের এই সময়ে ভালোবাসা যেন তার পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাসন্তী শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সজ্জিত যুগলদের হাসি-ঠাট্টা মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীটা এখনো সুন্দর কারণ এখানে ভালোবাসা বেঁচে আছে। ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে প্রিয়জনকে দেওয়া একগুচ্ছ রক্তগোলাপ কেবল একটি উপহার নয়, বরং তা হাজারো অব্যক্ত কথার সংকলন। যারা নতুন করে ভালোবাসার পৃথিবীতে পা রেখেছেন, তাদের জন্য এই দিনটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি যারা রূপালি চুল আর বলিরেখা মাখা মুখেও একে অপরের হাত ধরে আছেন, তাদের জন্য এটি আজন্মের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। সম্পর্কের ক্যানভাসে এই দিনটি এক চিমটি অতিরিক্ত রঙ ঢেলে দেয়, যা সারা বছর স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
নৈশব্দের ভাষায় হৃদয়ের আদিম আকুতি
ভালোবাসার প্রকৃত ভাষা সবসময় উচ্চকিত হয় না। কখনও কখনও নিস্তব্ধ নির্জনতায় পাশাপাশি বসে থাকা কিংবা ভিড়ের মাঝে শক্ত করে হাত ধরে রাখাটাই হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা। ভালোবাসা দিবস মানেই যে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন হতে হবে, তা কিন্তু নয়। বরং প্রিয় মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি বিনিময় করা কিংবা তার পছন্দের গানটি গুনগুন করে গাওয়ার নামই হলো প্রকৃত রোমান্টিকতা। এই যান্ত্রিক যুগে আমরা যখন কেবলই ছুটে চলছি, তখন এই একটি দিন আমাদের শেখায় একটু থামতে, প্রিয়জনের কথা শুনতে এবং নিজের আবেগগুলোকে প্রকাশ করতে। একটি সাধারণ চিরকুটে লেখা ‘তোমাকে খুব ভালোবাসি’- এই চারটি শব্দ দামী হীরা-জহরতকেও হার মানাতে পারে যদি তাতে হৃদয়ের ছোঁয়া থাকে।
বিশ্বাসের বুনন আর চিরন্তন সম্পর্কের রসায়ন
একটি সার্থক সম্পর্কের মূলে থাকে অগাধ বিশ্বাস আর একে অপরের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। ভালোবাসা দিবস আমাদের সেই আস্থার কথাটিই মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটি দীর্ঘস্থায়ী প্রেমের পেছনে থাকে অনেক ত্যাগ, অনেক ধৈর্য আর একে অপরের ভুলগুলোকে সুন্দরভাবে গ্রহণ করে নেওয়ার মানসিকতা। আজকের এই বিশেষ দিনে যুগলরা যখন একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তারা কেবল বর্তমানকে নয়, বরং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎকেও কল্পনা করে। একে অপরের স্বপ্নগুলোকে ভাগ করে নেওয়া, বিপদে ছায়ার মতো পাশে থাকা আর দিনশেষে একে অপরের হাসির কারণ হওয়া- এই ছোট ছোট অঙ্গীকারগুলোই একটি সম্পর্ককে পূর্ণতা দেয়। প্রিন্ট মিডিয়ার পাতায় যখন আমরা সফল প্রেমের গল্প পড়ি, তখন দেখি সেখানে কেবল আবেগ নয়, বরং একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতাও সমানভাবে কাজ করে।
গোধূলি বেলার মৌন অঙ্গীকার ও শেষ কথা
সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ে আর দিনের আলো ম্লান হয়ে আসে, তখন ভালোবাসার রেশটুকু যেন আরও গভীর হয়। ভালোবাসা দিবস আমাদের জীবনে বারবার ফিরে আসে এই বার্তা নিয়ে যে, দিনশেষে ভালোবাসাই একমাত্র সত্য। সম্পর্কের আকাশে মাঝে মাঝে মেঘ জমে, বৃষ্টি ঝরে, কিন্তু সেই মেঘ কাটিয়ে আবার রোদ্দুর হাসে কেবল ভালোবাসার টানে। তাই এই ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের চাওয়া হোক কেবল ক্ষণিকের ভালো লাগা নয়, বরং আজীবনের এক নিবিড় পথচলা। পৃথিবীর সমস্ত দ্বেষ আর কলহ মুছে গিয়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি কোণে। প্রতিটি মানুষ খুঁজে পাক তার কাঙ্ক্ষিত আপনজনকে, আর সেই বন্ধন অটুট থাকুক অনন্তকাল। ভালোবাসা দিবসের এই স্নিগ্ধ আলোয় প্রতিটি হৃদয় হয়ে উঠুক একেকটি ভালোবাসার অভয়অরণ্য।