মানুষ সৃষ্টিরও বহু আগে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছিলেন আরেকটি বুদ্ধিমান জাতি—জিন। তারা মানুষের মতোই বিবেকসম্পন্ন, দায়িত্বশীল এবং আল্লাহর আদেশ–নিষেধের আওতাভুক্ত। কোরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মানুষ ও জিন— এই দুই জাতিকে সৃষ্টি করার মূল উদ্দেশ্য একটাই: আল্লাহর ইবাদাত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল এজন্য যে, তারা আমার ইবাদাত করবে।’ (সুরা জারিয়াত: ৫৬)
মানুষের মতো জিন জাতির কাছেও পাঠানো হয়েছে নবী ও রাসুল। কোরআনে আল্লাহ প্রশ্ন করেন, ‘হে জিন ও মানব সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্য থেকেই কি তোমাদের কাছে রাসুল আসেনি?’ (সুরা আনআম: ১৩০)। এই আয়াত প্রমাণ করে, জিনদের ওপরও আল্লাহর বিধান কার্যকর ছিল।
মানবজাতির জন্য যেমন শেষ নবী, তেমনি জিন জাতির জন্যও শেষ নবী ও রাসুল ছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তার প্রতি ঈমান আনা জিনদের জন্যও ফরজ ছিল। নবুওয়াতের আগে জিনেরা আকাশের বিভিন্ন স্তরে গিয়ে সংবাদ শুনতে পারত। কিন্তু ওহি নাজিলের সূচনার পর আকাশ কঠোরভাবে সংরক্ষিত করে দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশকে সুরক্ষিত করেছি প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান থেকে।’ (সুরা হিজর: ১৭)
এই হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধানে জিনদের একটি দল পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়, তায়েফ থেকে মক্কা ফেরার পথে, নাখলা নামক স্থানে ফজরের নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন নবীজি (সা.)। ভোরের নিস্তব্ধতায় সেই তেলাওয়াত জিনদের কানে পৌঁছায়। তারা থেমে যায়, মনোযোগ দিয়ে শোনে—আর কোরআনের বাণী তাদের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়।
কোরআনে সেই ঘটনার বর্ণনা এসেছে সুরা জিনে— ‘আমরা এক বিস্ময়কর কোরআন শুনেছি, যা সঠিক পথের দিকে নির্দেশ করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি।’ (সুরা জিন: ১–২)। সেই মুহূর্তেই জিনদের একটি দল ইসলাম গ্রহণ করে।
ইসলাম গ্রহণের পর তারা নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নেয়। তারা ফিরে যায় নিজ সম্প্রদায়ের কাছে এবং দাওয়াত দেয় ঈমানের। কোরআনে তাদের আহ্বান উদ্ধৃত হয়েছে—’হে আমাদের সম্প্রদায়, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া দাও। তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং ভয়াবহ শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন।’ (সুরা আহকাফ: ২৯–৩১)
আজও এই পৃথিবীতে জিনদের মধ্যে কেউ মুসলমান, কেউ অবিশ্বাসী—ঠিক মানুষের মতোই। কেউ আলোর পথে, কেউ অন্ধকারে। কিন্তু নাখলার সেই এক ভোর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। কারণ সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল— কোরআনের হিদায়াত শুধু দৃশ্যমান মানুষের জন্য নয়, বরং অদৃশ্য হৃদয়ের জন্যও।
কোরআন মানুষকে বদলায়— আর বদলে দেয় জিনদেরও।