জমজম— মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পানি। হজ বা ওমরাহ পালনকারীরা এই পানিকে সঙ্গে না নিয়ে ফিরে আসার কথা ভাবতেই পারেন না। মসজিদুল হারামের ভেতরে অবস্থিত এই কূপ কাবা শরিফ থেকে মাত্র ২০ মিটার দূরে, এবং মুসলমানদের বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক জীবনের অঙ্গ।
ইতিহাস অনুযায়ী, জমজম কূপ একসময় প্রায় ৪৫০ বছর হারিয়ে গিয়েছিল। মক্কার প্রাচীন জুরহুম গোত্র কূপের পানিকে সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দেয় এবং কাবা ঘরের হাদিয়া লুণ্ঠন করে। ধর্মীয় অবক্ষয় ও পাপাচারের ফলে কূপটি ধীরে ধীরে মাটিতে চাপা পড়ে এবং মানুষ তা ভুলে যায়। তখনও কূপের ভেতরে রাখা ছিল দুটি সোনার হরিণ, কয়েকটি তলোয়ার ও মূল্যবান সামগ্রী, যা পরে আবিষ্কৃত হয়।
দীর্ঘ চারশো বছরের গৌরবময় ঘুমের পর, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নে আদেশ পান কূপ খননের। তিনি পুত্রসহ খনন শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করলেও, শেষমেষ পুনরায় পাওয়া যায় হারানো সোনার হরিণ ও তলোয়ার। তখনই প্রমাণিত হয়— স্বপ্ন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে, এবং জমজম কূপ আবারো প্রবাহিত হতে শুরু করে।
আজও এই কূপ থেকে একটানা পানি বের হচ্ছে। সৌদি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম সচল কূপ হিসেবে বিবেচিত। কূপের গভীরতা প্রায় ৩০ মিটার এবং প্রতি সেকেন্ডে উৎপাদন করতে পারে ১৮.৫ লিটার পানি। সৌদি জিওলজিক্যাল সার্ভে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে কূপের পানি বিশুদ্ধতা, মান ও সরবরাহ নিশ্চিত করছে।
জমজম শুধু পানি নয়; এটি বিশ্বাস, ইতিহাস ও বরকতের এক অনন্ত উৎস। গবেষণায় দেখা গেছে, জমজমের পানি খনিজসমৃদ্ধ, এবং তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি শরীরের জন্যও স্বাস্থ্যকর। ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এই কূপ আজও কোটি কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা ও আত্মার শান্তি মেটাচ্ছে।
জমজম কূপের অলৌকিকতা, স্থায়িত্ব এবং স্রোতের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে— মানব ইতিহাসের কোন বিপর্যয়ই আল্লাহর দেওয়া বরকতকে স্তব্ধ করতে পারে না। যে পানি একসময় হারিয়ে গিয়েছিল, আজও মানুষকে আধ্যাত্মিক ও শারীরিক তৃপ্তি দিচ্ছে।