সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত বালুরাশির নিচে কোটি কোটি বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা এক রহস্যময় দানবের নতুন পরিচয় বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে। নাইজারের দুর্গম অঞ্চলে আবিষ্কৃত এই জীবাশ্মটি ডাইনোসর জগতের অন্যতম রোমাঞ্চকর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা স্পিনোসরাস পরিবারের এই নতুন সদস্যের নাম দিয়েছেন ‘স্পিনোসরাস মিরাবিলিস’, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘বিস্ময়কর মেরুদণ্ডী সরীসৃপ’। এই আবিষ্কারটি কেবল একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান নয়, বরং প্রাগৈতিহাসিক জলজ ও স্থলজ শিকারি প্রাণীদের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক।
এক প্রাগৈতিহাসিক বিস্ময়
নাইজারের সাহারা মরুভূমি আজ ধু-ধু বালিয়াড়ি হলেও প্রায় সাড়ে নয় কোটি বছর আগে এটি ছিল নদী-নালা এবং জলাভূমিতে ঘেরা এক সবুজ মায়াপুরী। সেখানেই রাজত্ব করত স্পিনোসরাস মিরাবিলিস। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে এই নতুন প্রজাতিটি মাংশাসী ডাইনোসরদের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ আকার ধারণ করত। এর শরীরের কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে এটি সমসাময়িক অন্যান্য থেরোপড ডাইনোসরদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। এর পিঠের ওপর থাকা বিশাল ব্লেড আকৃতির ঝুঁটি বা ‘সেইল’ একে যেমন ভয়ংকর রূপ দিয়েছিল, তেমনি এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার কাজেও ব্যবহৃত হতো বলে গবেষকরা ধারণা করছেন।
স্পিনোসরাস মিরাবিলিসের অনন্য শারীরিক গঠন ও অভিযোজন
স্পিনোসরাস মিরাবিলিসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর মাথার গঠন এবং শিকার করার পদ্ধতি। গবেষকদের মতে এর চোয়াল ছিল অনেকটা আধুনিক কুমিরের মতো লম্বাটে এবং শক্তিশালী। দাঁতগুলো ছিল খাঁজকাটা এবং পিচ্ছিল মাছ ধরার জন্য বিশেষভাবে বিবর্তিত। এই বিশেষ দাঁতের গঠন প্রমাণ করে যে মিরাবিলিস মূলত একটি আধা-জলচর শিকারি ছিল। এটি অগভীর জলে ওত পেতে থাকত এবং অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে বিশাল আকৃতির মাছ শিকার করত। এর বিশাল দেহের ভার সামলানোর জন্য এর হাড়ের ঘনত্ব ছিল অনেক বেশি, যা একে জলের নিচে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করত।
ইজিপ্টিয়াকাস বনাম মিরাবিলিস: প্রজাতির ভিন্নতা
দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ববাসী কেবল ‘স্পিনোসরাস ইজিপ্টিয়াকাস’ নামক প্রজাতিটির সাথেই পরিচিত ছিল, যার জীবাশ্ম ১৯১৫ সালে মিশরে পাওয়া গিয়েছিল। জুরাসিক পার্কের মতো চলচ্চিত্রে এই ইজিপ্টিয়াকাস প্রজাতিটিকেই ভয়ংকর এক খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে নাইজারে পাওয়া এই নতুন ‘মিরাবিলিস’ প্রজাতিটি পূর্বের প্রজাতির তুলনায় বেশ কিছু মৌলিক বৈচিত্র্য বহন করে। বিশেষ করে এর করোটির গঠন এবং পিঠের ওপর থাকা হাড়ের কাঁটা বা ঝুঁটির বিন্যাস একে ইজিপ্টিয়াকাস থেকে আলাদা করেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে এটি স্পিনোসরাস গণ বা জেনাসের দ্বিতীয় পরিচিত প্রজাতি, যা এই ডাইনোসর পরিবারের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করল।
বিবর্তনীয় গুরুত্ব ও বৈশ্বিক গবেষণায় নতুন মাত্রা
এই আবিষ্কারটি প্যালিওন্টোলজি বা জীবাশ্ম বিজ্ঞানের জগতে নতুন তর্কের জন্ম দিয়েছে। স্পিনোসরাস মিরাবিলিসের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে উত্তর আফ্রিকায় এই বিশালকায় শিকারি প্রাণীদের বিবর্তন অত্যন্ত জটিল এবং বৈচিত্র্যময় ছিল। নাইজারের এই অঞ্চলটি বর্তমানে অত্যন্ত উষ্ণ এবং প্রতিকূল হলেও এর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর অমূল্য সব দলিল। আন্তর্জাতিক গবেষক দল এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের মতো সংস্থাগুলোর সহায়তায় চালানো এই অভিযানটি আমাদের জানান দিচ্ছে যে ডাইনোসরদের বিলুপ্তির ইতিহাস যতটা ধ্বংসাত্মক ছিল, তাদের টিকে থাকার লড়াই ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি বিস্ময়কর।
তথ্যসূত্র: (NBC News – National Geographic Archive)