রমজানের বিকাল নামতেই পবিত্র কাবা শরিফ প্রাঙ্গণে নেমে আসে এক অনন্য আবহ। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। দিনের তাওয়াফ, সাঈ ও ইবাদতের ব্যস্ততার পরও কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই; বরং হাজারো মুসল্লির উপবেশনে সৃষ্টি হয় এক গভীর, স্থির নীরবতা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, ফুলকে ঘিরে থাকা মৌমাছির মতো ঈমানদার বান্দারা ঘিরে রেখেছেন বাইতুল্লাহকে।
পবিত্র মসজিদুল হারাম-এর ভেতর ও বিস্তীর্ণ আঙিনাজুড়ে ইফতারের প্রস্তুতি শুরু হয় আসরের নামাজের পরপরই। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা সারিবদ্ধভাবে দস্তরখানা বিছিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায় সুশৃঙ্খল আসনব্যবস্থা। সৌদি আরবের সরকার, বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এবং স্থানীয় পরিবারগুলোর যৌথ উদ্যোগে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোজাদারের জন্য ইফতার পরিবেশন করা হয়।
ভেতরের অংশে সাধারণত পরিবেশন করা হয় খেজুর, পবিত্র জমজম কূপ-এর পানি এবং আরবি গাহওয়া। বাইরের আঙিনায় যোগ হয় রুটি, দই, মাঠা, কেক ও বিস্কুট। সবকিছুই সুনির্দিষ্ট প্যাকেটে সাজানো থাকে, যাতে বিতরণে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়। ইফতারের ঠিক আগে কাবার প্রবেশপথ ও করিডরজুড়ে খেজুর বিতরণের দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। বিতরণকারীদের মুখে থাকে এক অপার্থিব প্রশান্তি— যেন বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই তারা খুঁজে পান হৃদয়ের পরিতৃপ্তি।
মক্কার তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ, এমনকি পুরো পরিবার নিয়েও অনেকে এই ইফতারের আয়োজন করেন। তাদের বিশ্বাস, মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সেই সুসংবাদ— ‘যে রোজাদারকে ইফতার করায়, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।’ এই বিশ্বাসই তাদের অনুপ্রেরণা।
ইফতারের মুহূর্ত ঘনিয়ে এলে হাজারো হাত একসঙ্গে দোয়ার জন্য উঠে যায়। আজানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়তেই খেজুর মুখে তুলে নেন মুসল্লিরা। সেই দৃশ্য শুধু দেখার নয়—অনুভব করার। মনে হয়, ইফতার এখানে কেবল আহার নয়; এটি ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
রমজানের এই বিকেলগুলোতে মক্কা যেন শুধু একটি শহর থাকে না— পরিণত হয় ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য পাঠশালায়।