Thursday 05 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মারভিন পিপকিনের ঘরের আলো আবিষ্কারের গল্প

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৫ মার্চ ২০২৬ ১৬:৫৬

আজকাল আমরা ঘরের বৈদ্যুতিক সুইচ টিপলেই যে নরম ও স্নিগ্ধ আলোতে চারপাশ ভরে ওঠে, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক দশকেরও বেশি সময়ের এক অমীমাংসিত বৈজ্ঞানিক ধাঁধা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বৈদ্যুতিক বাল্ব উদ্ভাবিত হলেও তার আলো ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং চোখের জন্য অস্বস্তিকর। সেই চড়া আলো থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে আরামদায়ক আলো উপহার দিয়েছিলেন জেনারেল ইলেকট্রিক-এর এক অদম্য প্রকৌশলী মারভিন পিপকিন। তার সেই সাধারণ অথচ যুগান্তকারী উদ্ভাবনটিই আধুনিক ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।

এক অস্বস্তিকর উজ্জ্বলতার যুগ

বিজ্ঞাপন

এডিশনের বাল্ব বিশ্বকে আলোকিত করলেও শুরুর দিকের সেই বাল্বগুলো ছিল একদম স্বচ্ছ কাঁচের তৈরি। ভেতরের ফিলামেন্টের সেই তীব্র আলো সরাসরি চোখে লাগার ফলে তা মানুষের চোখের জন্য যথেষ্ট পীড়াদায়ক ছিল। অফিস বা বাসাবাড়িতে দীর্ঘক্ষণ সেই আলোতে কাজ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। বিজ্ঞানীরা জানতেন যে, কাঁচের ভেতরটা যদি কিছুটা ঝাপসা বা ‘ফ্রস্টেড’ করে দেওয়া যায়, তবে আলোটি চারদিকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং চোখের জন্য সহনীয় হবে। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায় কাঁচের ভেতরের অংশকে রাসায়নিকভাবে ক্ষয় বা এচিং করতে গেলেই তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ত এবং বাল্বটি সামান্য আঘাতেই ভেঙে যেত।

অসম্ভবকে সম্ভব করার সেই ক্ষণ

১৯২৫ সালের দিকে মারভিন পিপকিন যখন এই সমস্যা নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন তার সহকর্মীরা অনেকেই বিষয়টিকে প্রায় অসম্ভব বলে ধরে নিয়েছিলেন। এর আগে অনেকেই বাল্বের বাইরের অংশে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাতে বাল্বের কার্যকারিতা কমে যেত এবং ধুলোবালি জমে আলো দ্রুত ফিকে হয়ে আসত। পিপকিন দীর্ঘ গবেষণার পর এক অনন্য পদ্ধতি উদ্ভাবন করলেন। তিনি আবিষ্কার করলেন যে, অ্যাসিড-এচিং প্রক্রিয়ায় কাঁচকে দুইবার রাসায়নিকভাবে ট্রিটমেন্ট করলে তার ভেতরের তলটি যেমন মসৃণ ও ঝাপসা হয়, তেমনি কাঁচের গঠনগত শক্তিও অটুট থাকে। এই আবিষ্কারটি ছিল আলোক প্রকৌশলের ইতিহাসে এক বড় ধরনের ব্রেকথ্রু।

দৈনন্দিন জীবনে স্নিগ্ধতার বিপ্লব

পিপকিনের এই উদ্ভাবনের ফলে ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বগুলো রাতারাতি বদলে গেল। আগেকার সেই চোখ ধাঁধানো চড়া আলোর বদলে তৈরি হলো ‘সফট হোয়াইট’ বা নরম সাদা আলো। এটি কেবল পড়ার টেবিল বা শোবার ঘরের পরিবেশকেই বদলে দেয়নি, বরং বৈদ্যুতিক আলোর গ্রহণযোগ্যতাকে সাধারণ মানুষের কাছে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাল্বের ভেতরের এই ফ্রস্টেড আবরণ আলো সরবরাহকারী ফিলামেন্টের ঝলকানি কমিয়ে একধরনের সাম্য তৈরি করত, যা কয়েক দশক ধরে সারা বিশ্বের ঘরোয়া আলোর মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ছোট বদল যখন বড় স্বস্তি আনে

মারভিন পিপকিনের এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির সার্থকতা কেবল নতুন কিছু তৈরিতে নয়, বরং বিদ্যমান বস্তুকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার মধ্যে। তার সেই দুই ধাপের অ্যাসিড-এচিং পদ্ধতিটি ছিল এক অসাধারণ প্রকৌশলগত বুদ্ধিমত্তা। আজ আমরা রাতে যখন কোনো বই পড়ি বা পরিবার নিয়ে ডিনার টেবিলের স্নিগ্ধ আলোতে বসি, তখন অজান্তেই মারভিন পিপকিনের সেই নীরব উদ্ভাবনের সুফল ভোগ করি। বড় কোনো গর্জন ছাড়াই তিনি আমাদের অন্ধকার জগতকে করেছিলেন আরও মায়াবী ও সহনীয়।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর