Friday 06 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রিয়াজুল জান্নাত: দুনিয়ার বুকে জান্নাতের এক টুকরো বাগান

সানজিদা যুথী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:৫২ | আপডেট: ৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:৫৫

মুসলিম বিশ্বের কাছে পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র ও আবেগঘন স্থান হলো মদিনা শরীফে অবস্থিত মসজিদে নববী। এই মসজিদের ভেতরেই রয়েছে এমন একটি জায়গা, যাকে অনেকেই দুনিয়ার বুকে জান্নাতের একটি অংশ হিসেবে মনে করেন। সেই পবিত্র স্থানটির নাম রিয়াজুল জান্নাত। মুসলমানদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই স্থানটি বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছে।

ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই এই স্থানটির বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের স্থানটি জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান।’ এই হাদিস থেকেই জায়গাটির নাম হয়েছে রিয়াজুল জান্নাত, যার অর্থ ‘জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান’। মুসলমানদের বিশ্বাস, কিয়ামতের দিন এই অংশটি জান্নাতের বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থানের অন্তর্ভুক্ত হবে।

বিজ্ঞাপন

মসজিদে নববীর ভেতরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হুজরা মোবারক থেকে তার মিম্বর পর্যন্ত যে অংশটি রয়েছে, সেটিই রিয়াজুল জান্নাত হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই অংশটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২২ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১৫ মিটার। বর্তমানে মসজিদের ভেতরে এই স্থানটি আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে। মসজিদের অধিকাংশ স্থানে লাল রঙের কার্পেট থাকলেও রিয়াজুল জান্নাতে সবুজ রঙের কার্পেট বিছানো থাকে, যাতে মুসল্লিরা সহজেই জায়গাটি চিনতে পারেন।

এই পবিত্র স্থান শুধু আধ্যাত্মিক গুরুত্বের জন্যই নয়, বরং ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের বহু স্মৃতিরও সাক্ষী। রিয়াজুল জান্নাতের এক পাশে ছিল আসহাবে সুফফার স্থান। এখানে প্রায় সত্তর জন দরিদ্র সাহাবি অবস্থান করতেন, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইলম অর্জন, ইবাদত ও ইসলামের শিক্ষা প্রচারের কাজে। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা (রা.) তাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি নবীজীর কাছ থেকে অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করে ইসলামের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন।

এ স্থানটির আরেক পাশে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক স্থান, যেখানে থেকে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রা.) আজান দিতেন। মক্কায় ইসলাম গ্রহণের কারণে তিনি কঠোর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। পরে হযরত আবু বকর (রা.) তাকে মুক্ত করে দেন এবং তিনি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী হন।

রিয়াজুল জান্নাতের ভেতরেই রয়েছে মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক মিম্বরের স্থান। এখান থেকেই তিনি সাহাবিদের উদ্দেশে খুতবা দিতেন, ইসলামের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। বর্তমানে সেই স্থানের পাশে একটি আধুনিক মিম্বর নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে মসজিদে নববীর ইমামরা জুমা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খুতবা প্রদান করেন।

এই পবিত্র অংশের কাছেই রয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হুজরা মোবারক। ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত আছে, জীবনের শেষ সময়ে তিনি একবার হুজরার পর্দা সরিয়ে দেখেছিলেন যে হযরত আবু বকর (রা.) মুসল্লিদের নিয়ে ফজরের নামাজের জামাত পরিচালনা করছেন। সেই দৃশ্য দেখে সাহাবায়ে কেরাম গভীর আনন্দ ও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

রিয়াজুল জান্নাতে কয়েকটি ঐতিহাসিক খুঁটি বা স্তম্ভ রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন নামে পরিচিত। এগুলোকে অনেক সময় ‘রহমতের খুঁটি’ বলা হয়। নবীজীর যুগে এগুলো খেজুর গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন খিলাফত আমলে এগুলো সংস্কার করা হয়। এসব খুঁটির মধ্যে রয়েছে উসতুওয়ানা আয়েশা, উসতুওয়ানাতুত তওবা, উসতুওয়ানাতুল উফুদ, উসতুওয়ানা মুখাল্লাকাহসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হজ ও ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মদিনায় আগত মুসলমানদের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা থাকে— রিয়াজুল জান্নাতে অন্তত দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা। অনেক সময় সেখানে প্রবেশের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তবুও এই পবিত্র স্থানে কিছু সময় ইবাদতে কাটানোর অনুভূতি মুসলমানদের কাছে এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি এনে দেয়।

মসজিদে নববীর নীরব পরিবেশ, কারুকার্যখচিত স্থাপত্য, ঝাড়বাতির আলো এবং নবীজীর স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস— সব মিলিয়ে রিয়াজুল জান্নাত যেন আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য স্থান। এখানে এসে অনেক মুসলমান অনুভব করেন হৃদয়ের গভীর এক শান্তি, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

বিশ্বাস, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সমন্বয়ে রিয়াজুল জান্নাত মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অমূল্য সম্পদ। এই পবিত্র স্থানটি যেন যুগ যুগ ধরে মানুষকে নবীজীর ভালোবাসা ও ইসলামের সৌন্দর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর