১৮৭৬ সালের ৭ মার্চ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই দিনটিতেই আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল তার সহকারী থমাস ওয়াটসনকে উদ্দেশ্য করে ইতিহাসের প্রথম সফল টেলিফোন বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। “মিস্টার ওয়াটসন, এখানে আসুন, আমি আপনাকে দেখতে চাই”— সামান্য এই কটি শব্দই দূরত্বের দেয়াল ভেঙে দিয়ে বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলার সূচনা করেছিল। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর ৭ মার্চ ‘আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল দিবস’ পালন করা হয়। দিনটি কেবল একজন উদ্ভাবকের জন্মদিন বা একটি বিশেষ মুহূর্তের উদ্যাপন নয়, বরং মানুষের কণ্ঠস্বরকে দিগন্তের ওপারে পৌঁছে দেওয়ার সেই অদম্য জেদকে স্মরণ করার একটি বিশেষ উপলক্ষ।
স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে ১৮৪৭ সালের ৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করা এই মনীষীর পুরো জীবনটাই ছিল শব্দ এবং শোনার সক্ষমতা নিয়ে গবেষণায় নিমগ্ন। তার মা এবং স্ত্রী— উভয়েই ছিলেন বধির, যা তাকে মানুষের কথা বলার ধরণ এবং শব্দ তরঙ্গ নিয়ে কাজ করতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বেলের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা যা মানুষের কণ্ঠস্বরকে বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তর করে তারের মাধ্যমে দূর-দূরান্তে পাঠাতে পারবে। তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথটি খুব একটা মসৃণ ছিল না। সে সময় টেলিগ্রাফের জয়জয়কার থাকলেও মানুষের জীবন্ত কণ্ঠস্বর প্রেরণের ধারণাটি ছিল অনেকের কাছে অকল্পনীয়। কিন্তু বেল তার বিজ্ঞানমনস্কতা এবং অসীম ধৈর্য নিয়ে হারমোনিক টেলিগ্রাফের ধারণা থেকে ধীরে ধীরে টেলিফোনের নকশা তৈরি করেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৮৭৬ সালের ৭ মার্চ তিনি টেলিফোনের পেটেন্ট লাভ করেন, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলকে কেবল টেলিফোনের আবিষ্কারক হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে তার প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন চিন্তাবিদ। তার উদ্ভাবিত ‘ফোটোফোন’ ছিল আজকের আধুনিক অপটিক্যাল ফাইবার প্রযুক্তির পূর্বসূরি, যা আলোর সাহায্যে শব্দ পাঠাতে সক্ষম ছিল। এ ছাড়াও তিনি মেটাল ডিটেক্টর, হাইড্রোফয়েল নৌকা এবং বিমান চালনাবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ন্যাশন্যাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম এবং এই প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তার পেছনে তার দূরদর্শী চিন্তার বড় ভূমিকা ছিল। তবে এতসব সাফল্যের মাঝেও তিনি নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিতেই সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করতেন। বধিরদের শিক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তিনি যে কাজ করে গেছেন, তা আজও অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
বর্তমানে আমরা যখন স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের অপর প্রান্তের মানুষের সাথে কথা বলি, তখন আমাদের অজান্তেই বেলের সেই আদি প্রযুক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এই বিশেষ দিবসে তাঁর জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায় যে, প্রতিটি বড় উদ্ভাবনের পেছনে থাকে অগণিত ব্যর্থতা আর গভীর মানবিক বোধ।
বেল বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন একটি দরজা বন্ধ করে দেয়, তখন অন্য একটি নতুন দরজা খুলে যায়; কিন্তু আমরা বন্ধ দরজার দিকে এত দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকি যে, নতুন যে পথটি তৈরি হয়েছে তা দেখতেই পাই না। তার এই জীবনদর্শন এবং আবিষ্কারের নেশা আজকের প্রজন্মকে নতুন কিছু করার সাহস জোগায়।
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল দিবস মূলত আমাদের সেই সোনালী মুহূর্তটির কথা মনে করিয়ে দেয়, যা থেকে বিশ্বায়নের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং যোগাযোগের সংজ্ঞাই চিরতরে বদলে গিয়েছিল।