Saturday 07 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কাকের অদ্ভুত বুদ্ধিমত্তা!

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৭ মার্চ ২০২৬ ১৮:৩৫

আমাদের চারপাশে সবচেয়ে পরিচিত পাখিগুলোর একটি হলো Crow বা কাক। শহরের ছাদে, গাছের ডালে কিংবা রাস্তার ধারে তাদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা অনেক সময় এই পাখিটিকে খুব সাধারণ বলেই ধরে নিই। কিন্তু আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞান ও আচরণগত গবেষণা বলছে, এই পরিচিত পাখিটির ভেতরে লুকিয়ে আছে অত্যন্ত জটিল বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক আচরণ। অনেক গবেষকের মতে, কাকের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, স্মৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক বোঝার দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণীর সমতুল্য।

উন্নত মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

পাখিদের মস্তিষ্ক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো গঠনের না হলেও তাদের মধ্যে কিছু প্রজাতি অত্যন্ত উন্নত জ্ঞানীয় ক্ষমতা প্রদর্শন করে। কাক এই তালিকার অন্যতম। কাকের মস্তিষ্কে ‘নিডোপ্যালিয়াম’ নামের যে অংশটি রয়েছে, তা জটিল চিন্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অংশে নিউরনের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, যা তাদের দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ এবং শেখার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

এই কারণেই কাক শুধু খাবার খুঁজে নেওয়ার মতো সাধারণ আচরণেই দক্ষ নয়, বরং তারা পরিবেশ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনেক পরীক্ষায় দেখা গেছে, তারা এমন সমস্যার সমাধান করতে পারে যেখানে একাধিক ধাপ চিন্তা করে এগোতে হয়। অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনের আগে তারা মানসিকভাবে পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে।

মানুষের মুখ মনে রাখার বিস্ময়কর ক্ষমতা

কাকের স্মৃতিশক্তি নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের University of Washington–এর গবেষকরা। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, কাক মানুষের মুখ আলাদাভাবে চিনতে এবং দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারে। পরীক্ষায় গবেষকেরা নির্দিষ্ট ধরনের মুখোশ পরে কাক ধরার চেষ্টা করেছিলেন। পরে একই মুখোশ পরে আবার সেই এলাকায় গেলে কাকেরা আক্রমণাত্মক আচরণ দেখায়।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তথ্য কেবল সেই কাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা ডাক ও আচরণের মাধ্যমে অন্য কাকদেরও সতর্ক করে দেয়। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক কাক সেই নির্দিষ্ট মুখ বা ব্যক্তিকে বিপজ্জনক হিসেবে চিনে নিতে শুরু করে। এই আচরণ থেকে বোঝা যায় যে কাকের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক শিক্ষা বা সাংস্কৃতিক তথ্য আদান–প্রদান ঘটে।

কাকের সমাজে পারস্পরিকতা ও ন্যায়বোধ

কাক সাধারণত দলবদ্ধভাবে বসবাস করে এবং তাদের দলে একটি জটিল সামাজিক কাঠামো থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার ভাগাভাগি কিংবা সহযোগিতার ক্ষেত্রে কাকদের মধ্যে এক ধরনের পারস্পরিকতার ধারণা কাজ করে। যখন কোনো কাক দলের সঙ্গে সহযোগিতা করে বা বিপদের সময় অন্যদের পাশে দাঁড়ায়, তখন তাকে দলের অন্য সদস্যরা সহজে গ্রহণ করে।

কিন্তু কোনো সদস্য যদি বারবার স্বার্থপর আচরণ করে বা খাবার ভাগাভাগির নিয়ম ভঙ্গ করে, তখন অন্য কাকেরা সেই আচরণ মনে রাখে। পরবর্তী সময়ে দলগত কোনো কাজে তাকে এড়িয়ে চলার প্রবণতা দেখা যায়। এই আচরণকে অনেক বিজ্ঞানী প্রাথমিক সামাজিক ন্যায়বোধ বা ‘প্রোটো-সোশ্যাল জাস্টিস’ ধারণার সঙ্গে তুলনা করেন। অর্থাৎ কাকের সমাজে সম্পর্ক কেবল শক্তির ওপর নির্ভর করে না; সেখানে বিশ্বাস, স্মৃতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত সঙ্গীর প্রতি কাকের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া

কাকের আরেকটি বিস্ময়কর আচরণ হলো তাদের মৃত সঙ্গীকে ঘিরে জড়ো হওয়া। কোনো কাক মারা গেলে আশেপাশের অনেক কাক সেখানে এসে জড়ো হয় এবং জোরে ডাকতে থাকে। গবেষকেরা এই আচরণকে কখনও কখনও “crow gathering” বা অনানুষ্ঠানিকভাবে “crow funeral” বলে উল্লেখ করেন।

তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি শোক প্রকাশের চেয়ে বেশি একটি শেখার প্রক্রিয়া। কাকেরা সম্ভবত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বোঝার চেষ্টা করে কেন তাদের সঙ্গীটি মারা গেছে এবং সেই জায়গায় কোনো বিপদ আছে কি না। এর মাধ্যমে তারা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা তৈরি করে।

সরঞ্জাম ব্যবহার ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা

কাকের বুদ্ধিমত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরঞ্জাম ব্যবহার করার ক্ষমতা। বিশেষ করে New Caledonian crow প্রজাতির কাকরা গাছের ডাল বা পাতা ব্যবহার করে গর্তের ভেতর থেকে পোকা বের করে আনে। কখনও তারা ডালকে হুকের মতো আকারে বাঁকিয়ে নেয় যাতে সহজে খাবার টেনে বের করা যায়।

বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, তারা একাধিক ধাপে সমস্যার সমাধান করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো খাবার যদি এমন স্থানে রাখা হয় যেখানে পৌঁছাতে হলে আগে একটি সরঞ্জাম ব্যবহার করে অন্য সরঞ্জাম বের করতে হবে, তখনও তারা ধাপে ধাপে কাজ করে লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। এই ধরনের পরিকল্পিত আচরণ প্রাণিজগতে খুবই বিরল।

স্মৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক বন্ধনের গল্প

কাকের সমাজে স্মৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা শুধু ব্যক্তি বা বিপদ মনে রাখে না, বরং সেই তথ্য অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একটি বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আচরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এই বৈশিষ্ট্য কাকের সমাজকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, দলগত জীবন এবং শেখার ক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করে একটি জটিল সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে।

প্রকৃতির দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালে বোঝা যায়, বুদ্ধিমত্তা শুধু মানুষের একচেটিয়া সম্পদ নয়। কাকের জীবনধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর অনেক প্রাণীর মধ্যেই রয়েছে গভীর স্মৃতি, সম্পর্ক এবং সহযোগিতার শক্তিশালী ভিত্তি। এই পরিচিত কালো পাখিটি তাই কেবল শহরের আকাশে উড়ে বেড়ানো একটি সাধারণ প্রাণী নয়; বরং এটি প্রকৃতির এক বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর