Saturday 07 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

উহুদ যুদ্ধের ইতিহাস

সানজিদা যুথী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৭ মার্চ ২০২৬ ১৮:৩৭

ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা হলো উহুদ যুদ্ধ। হিজরি ৩ সালের ৭ শাওয়াল, মদিনার উত্তরে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলিমদের জন্য যেমন ত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস, তেমনি শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের এক অনন্য শিক্ষা বহন করে।

বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মক্কার কোরায়েশরা তিন হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের শক্তি ভেঙে দেওয়া এবং মদিনাকে চাপে ফেলা। এই পরিস্থিতিতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।

মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় সাতশ’ জন। যুদ্ধের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নবী করিম (সা.) উহুদ প্রান্তরের একটি ছোট পাহাড়ে— যা পরে রুমাত পাহাড় বা তীরন্দাজ পাহাড় নামে পরিচিত— ৫০ জন তীরন্দাজকে মোতায়েন করেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)। নবী করিম (সা.) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তারা যেন নিজেদের অবস্থান ছেড়ে না যায়।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধের শুরুতে মুসলিম বাহিনী সফলভাবে কোরায়েশদের প্রতিরোধ করে এবং শত্রু বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে কিছু মুসলিম তীরন্দাজ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিজেদের অবস্থান ছেড়ে নেমে আসেন। এতে পাহাড়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই সুযোগ কাজে লাগান কোরায়েশ বাহিনীর অশ্বারোহী বাহিনীর নেতা খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি)। তিনি পিছন দিক থেকে আক্রমণ চালান। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে হঠাৎ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং মুসলিম বাহিনী কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে।

এই যুদ্ধে মহানবী (সা.) নিজেও আহত হন। তার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয় এবং দাঁত মোবারক ভেঙে যায়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, নবী করিম (সা.) শহিদ হয়েছেন। এতে অনেক সাহাবা বিচলিত হয়ে পড়েন। তবে কিছু সাহাবা দৃঢ়ভাবে নবী করিম (সা.)-কে ঘিরে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেন এবং তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।

উহুদ যুদ্ধের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ছিল বহু সাহাবার শহিদ হওয়া। ইতিহাস অনুযায়ী, এই যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন সাহাবা শহিদ হন। তাদের মধ্যে ছিলেন নবী করিম (সা.)-এর প্রিয় চাচা ও ইসলামের বীর সেনানী হজরত হামজা (রা.)। তিনি অসাধারণ বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হন।

শহিদ সাহাবাদের উহুদ প্রান্তরেই দাফন করা হয়। আজও সেই কবরস্থান মুসলিম বিশ্বের জন্য এক গভীর আবেগ ও ইতিহাসের স্মারক। কবরগুলো সাধারণ ইট দিয়ে ঘেরা, এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের জন্য গ্রিল দিয়ে সীমিত করা হয়েছে।

উহুদ পাহাড় ও তার আশপাশের এলাকা আজও মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হাদিসে মহানবী (সা.) উহুদ পাহাড় সম্পর্কে বলেছেন, “উহুদ একটি পাহাড়, যা আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও তাকে ভালোবাসি।”

এই উক্তি শুধু একটি পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা নয়, বরং উহুদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আত্মত্যাগ, ঈমান ও ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক।

উহুদ যুদ্ধের ফলাফল সামরিক দিক থেকে অমীমাংসিত থাকলেও এর শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। এই যুদ্ধ মুসলিমদের শিখিয়েছে—আল্লাহর নির্দেশ ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং বিপদের সময় ধৈর্য ও ঈমান ধরে রাখাই প্রকৃত শক্তি।

ইতিহাসের এই অধ্যায় আজও মুসলিম উম্মাহকে মনে করিয়ে দেয়—ত্যাগ, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই মানুষের প্রকৃত বিজয়ের পথ।

সারাবাংলা/এসজে/এএসজি
বিজ্ঞাপন

উহুদ যুদ্ধের ইতিহাস
৭ মার্চ ২০২৬ ১৮:৩৭

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর