Sunday 08 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মাসুমেহ এবতেকার: মেরি থেকে ভাইস প্রেসিডেন্টের এক দীর্ঘ পথচলা

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৮ মার্চ ২০২৬ ১৫:২৬

১৯৭৯ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তেহরানের মার্কিন দূতাবাস যখন বিক্ষোভকারী ছাত্রদের দখলে, তখন বিশ্ব গণমাধ্যমের সামনে একজন তরুণী অনর্গল ইংরেজিতে বিপ্লবীদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতেন। পশ্চিমা সাংবাদিকরা তার চমৎকার ইংরেজি বলার দক্ষতার কারণে তাকে ‘মেরি’ নামে ডাকতেন। সেই মেরিই হলেন মাসুমেহ এবতেকার, যিনি পরবর্তীতে ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নারী হিসেবে আবির্ভূত হন।

বিপ্লবের কণ্ঠস্বর এবং দূতাবাস দখল

মাসুমেহ এবতেকার ছিলেন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শৈশবে বাবার সাথে দীর্ঘ সময় আমেরিকায় কাটানোর কারণে তিনি ইংরেজি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর যখন ছাত্ররা মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে, তখন তিনি সেই আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র নির্বাচিত হন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে তিনি যেভাবে জিম্মিদের অবস্থান এবং ইরানের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা ব্যাখ্যা করতেন, তা তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়।

বিজ্ঞাপন

জিম্মি সংকট ও বিশ্ব গণমাধ্যম

সে সময় মাসুমেহ এবতেকারকে প্রায়ই দূতাবাসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে দেখা যেত। সাদা-কালো ছবির সেই তরুণীটি কেবল একজন ছাত্র নেত্রী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বিপ্লবের আদর্শিক প্রচারক। যদিও পশ্চিমা বিশ্বে তাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা ছিল, কিন্তু ইরানের ভেতরে তিনি দেশপ্রেম এবং সাহসের প্রতীক হিসেবে গণ্য হতেন। ৪৪৪ দিনের সেই দীর্ঘ সংকটে তার প্রতিটি বক্তব্য ছিল অত্যন্ত ধারালো এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ক্ষমতার শীর্ষ সোপানে উত্থান

বিপ্লবের পর মাসুমেহ এবতেকার কেবল রাজনীতির মাঠেই থেমে থাকেননি, বরং শিক্ষা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি ইরানের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির আমলে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির শাসনামলেও তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিবেশ বিষয়ক অধিদপ্তর এবং নারী ও পরিবার বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলান।

পরিবেশ রক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন

ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার কর্মকাণ্ড ছিল বেশ প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ইরানের পরিবেশ রক্ষা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে তিনি অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেই নন, বরং একজন শিক্ষক এবং গবেষক হিসেবেও কাজ করেছেন। একজন কট্টরপন্থী বিপ্লবী থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক হওয়ার এই যাত্রা ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। তবে তার অতীত নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি; বিশেষ করে তার আমেরিকা ভ্রমণের ওপর এখনো অনেক বিধিনিষেধ বজায় রয়েছে।

স্মৃতিচারণ ও বর্তমান জীবন

মাসুমেহ এবতেকার তার সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা নিয়ে পরবর্তীতে বই লিখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তৎকালীন পরিস্থিতিতে সেই পদক্ষেপটি ছিল জাতির সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য। যদিও বয়সের ছাপ এবং হিজাবের ধরনে পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক দৃঢ়তা এখনো তাকে ইরানের রাজনীতিতে এক আলোচিত চরিত্র করে রেখেছে। বিপ্লবের সেই ‘মেরি’ থেকে আজকের ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ হওয়া— এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর