Wednesday 11 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইসলামের ঢাল হয়ে ওঠা তাতার রাজপুত্র বারকী খানের বীরত্বগাথা

ফারহানা নীলা সিনিয়র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১১ মার্চ ২০২৬ ১৭:২৩

ইতিহাসের পাতায় চেঙ্গিজ খানের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধুলো ওড়ানো ঘোড়সওয়ার আর ধ্বংসস্তূপের ছবি। কিন্তু সেই একই রক্তধারা থেকে এমন একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটবে, যিনি খোদ মঙ্গোল আগ্রাসনের সামনে দাঁড়িয়ে ইসলামের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠবেন, তা হয়তো সময়ের মহানায়ক হালাকু খানও স্বপ্নে ভাবেননি। আমরা বলছি গোল্ডেন হোর্ড বা তাতার সাম্রাজ্যের অধিপতি বারকী খানের কথা। ১২৫৮ সালে যখন বাগদাদের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল এবং ইলখানাত মঙ্গোলরা একের পর এক মুসলিম জনপদ মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছিল, তখন এই বারকী খানই হয়ে উঠেছিলেন হালাকু খানের দুঃস্বপ্ন। তার ইসলাম গ্রহণ কেবল একটি আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ছিল না, বরং তা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক মাস্টারস্ট্রোক।

বিজ্ঞাপন

খলিফার রক্তের বদলা ও মঙ্গোলদের গৃহযুদ্ধ

হালাকু খান যখন বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন, তখন বারকী খান রাগে ফেটে পড়েন। মঙ্গোল আভিজাত্যের প্রথা অনুযায়ী নিজের বংশীয় ভাই হলেও, বিশ্বাসের জায়গায় তিনি ছিলেন আপসহীন। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে হালাকু খলিফাকে হত্যা করে সীমালঙ্ঘন করেছেন এবং এর বিচার তিনি নিজেই করবেন। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের কেন্দ্র তখন কাঁপছিল বারকী খানের হুঙ্কারে। তিনি কৌশলে হালাকু খানকে সিরিয়া ও মিশর জয়ের পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুত করেন। ১২৬০ সালে আইন জালুত যুদ্ধে মামলুকদের কাছে হালাকু খানের বাহিনীর পরাজয়ের পেছনেও বারকী খানের বড় ভূমিকা ছিল। কারণ বারকী খানের সম্ভাব্য আক্রমণের ভয়ে হালাকু তার মূল বাহিনীর সিংহভাগ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন, যা সুলতান কুতুজ ও বাইবার্সের কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল।

তেরেক নদীর মহাপ্রলয় ও হালাকুর দম্ভ চূর্ণ

১২৬২ সালের শীতকাল ছিল হালাকু খানের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। ককেশাস অঞ্চলের তেরেক নদীর বরফজমা তীরে বারকী খান তার মঙ্গোল বাহিনীর ওপর এমন তান্ডব চালান যা ইতিহাসে বিরল। বারকী খানের নেতৃত্বে মুসলিম মঙ্গোল যোদ্ধারা হালাকুর বাহিনীকে কচুকাটা করে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হালাকুর হাজার হাজার সৈন্য নদী পার হতে গিয়ে বরফ ভেঙে কনকনে পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় হালাকু বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাকে থামানোর জন্য বাইরের কারো প্রয়োজন নেই, তার নিজের পরিবারের একজন সিংহপুরুষই যথেষ্ট। এই যুদ্ধের পর হালাকু আর কখনোই পশ্চিমের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাহস পাননি, যার ফলে মক্কা ও মদিনা মঙ্গোলদের করাল গ্রাস থেকে চিরতরে রক্ষা পায়।

মরুভূমির সুলতান ও তাতারদের সেতুবন্ধন

বারকী খান কেবল তরবারি দিয়েই ইসলাম রক্ষা করেননি, বরং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে এর বিস্তার ঘটিয়েছেন। মিশরের পরাক্রমশালী সুলতান রুকনউদ্দিন বাইবার্সের সাথে তার মিত্রতা ছিল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। তারা একে অপরকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে পত্রালাপ করতেন। বারকী খানের আমন্ত্রণে মিশর ও সিরিয়া থেকে অসংখ্য আলেম ও ধর্মপ্রচারক বর্তমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত গোল্ডেন হোর্ডে আসতে শুরু করেন। এর ফলে উত্তর এশিয়ার বিশাল তাতার জনগোষ্ঠী দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। আজ যে আমরা মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার বিশাল অঞ্চলে মুসলিম ঐতিহ্যের পদচিহ্ন দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই দূরদর্শী নওমুসলিম সম্রাট।

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এক মহাপ্রাণ

যদি বারকী খান সেদিন হালাকু খানের বিরুদ্ধে না দাঁড়াতেন, তবে আজ হয়তো বাগদাদের মতো কায়রো বা দামেস্কের গ্রন্থাগারগুলোও দজলা-ফোরাতের নীল নদে হারিয়ে যেত। তাকে গত এক হাজার বছরের অন্যতম প্রভাবশালী নওমুসলিম বলা হয় কারণ তিনি মঙ্গোলদের অজেয় থাকার মিথ ভেঙে দিয়েছিলেন। তার তাতার সাম্রাজ্য বা গোল্ডেন হোর্ড পরবর্তীতে কয়েকশ বছর ধরে এই অঞ্চলে ইসলামের ঝান্ডা সমুন্নত রেখেছিল। বারকী খান প্রমাণ করেছিলেন যে, রক্ত আর বংশ বড় কথা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও সঠিক আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন মানুষকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রাখে। তিনি ছিলেন একাধারে মঙ্গোল রাজপুত্র এবং মুসলিম বিশ্বের অতন্দ্র প্রহরী।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর