ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতায় যখনই কোনো জাতির পতন ঘনিয়ে আসে, তখনই প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মে দৃশ্যপটে এমন এক চরিত্রের উদয় ঘটে, যার তলোয়ারের ঝিলিক অন্ধকারের বুক চিরে নতুন ভোরের জানান দেয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর সেই ক্রান্তিলগ্নে, যখন বাগদাদের খলিফার রক্তে দজলা নদীর পানি কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছিল এবং ক্রুসেডারদের আস্ফালনে ভূমধ্যসাগরের তীরে আজানের ধ্বনি স্তিমিত হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই ধুমকেতুর মতো উদিত হয়েছিলেন অল-যাহির রুকনউদ্দিন বাইবার্স। তিনি কেবল একজন সুলতান ছিলেন না; তিনি ছিলেন ধসে পড়া মুসলিম সালতানাতের সেই ইস্পাত-কঠিন ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আজও ইসলামের ইতিহাস গর্ববোধ করে।
দাসত্ব থেকে সুলতান: এক অবিশ্বাস্য উত্থান
বাইবার্সের জীবনের শুরুটা কোনো রাজকীয় প্রাসাদে হয়নি। কিপচাক তুর্কি বংশোদ্ভূত এই মানুষটিকে বাল্যকালে মোঙ্গলরা বন্দি করে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছিল। সিরিয়ার বাজারে তাকে যখন আনা হয়, তখন তার শারীরিক গঠন আর চোখের তীব্র তেজ দেখে আইয়ুবী আমীররা তাকে কিনে নেন। কথিত আছে, তার চোখের এক অদ্ভুত ত্রুটির কারণে (এক চোখে সাদা দাগ) তাকে শুরুতে অনেকেই নিতে চায়নি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই ‘দাস’ ছেলেই হয়ে উঠলেন মিশরের মামলুক বাহিনীর মেরুদণ্ড। মানসুরা যুদ্ধে যখন ফ্রান্সের রাজা নবম লুইয়ের নেতৃত্বে সপ্তম ক্রুসেড মুসলিম বাহিনীকে প্রায় পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল, তখন বাইবার্সের সামরিক রণকৌশলই ক্রুসেডারদের শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত করেছিল এবং খোদ ফরাসি রাজাকে বন্দি হতে বাধ্য করেছিল।
আইন জালুত: অপরাজেয় মোঙ্গলদের দর্পচূর্ণ
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় সম্ভবত ১২৬০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরি হালাকু খানের মোঙ্গল বাহিনী যখন অপরাজেয় হিসেবে সারা বিশ্বে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তখন বাইবার্স এবং সুলতান কুতুজ তাদের মুখোমুখি হন ফিলিস্তিনের ‘আইন জালুত’ প্রান্তরে। এটি কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত পরীক্ষা। বাইবার্স তার সুনিপুণ ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে মোঙ্গলদের অগ্রযাত্রাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মোঙ্গলরা ময়দান থেকে পালিয়ে বাঁচতে বাধ্য হয়েছিল। এই বিজয়ই নিশ্চিত করেছিল যে, মিশর ও পবিত্র ভূমি হেজাজ মোঙ্গলদের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাবে।
কূটনীতি ও রণকৌশলের এক অনন্য সমন্বয়ক
সুলতান হওয়ার পর বাইবার্স বুঝেছিলেন, কেবল তলোয়ার দিয়ে রাজ্য রক্ষা সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন আধুনিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার জনক। কায়রো থেকে দামেস্ক পর্যন্ত তিনি এক অভাবনীয় দ্রুতগামী ডাক সার্ভিস বা ‘বারিদ’ ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, যা শত্রুর যেকোনো গতিবিধির খবর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুলতানের কাছে পৌঁছে দিত। তার শাসনামলেই ক্রুসেডারদের শক্ত ঘাঁটি ‘অ্যান্টিওক’ এবং অপরাজেয় দুর্গ ‘ক্রাক দেস শেভালিয়ার্স’ পদানত হয়। বাইবার্সের রণকৌশল ছিল অত্যন্ত নির্মম কিন্তু কার্যকর; তিনি শত্রুকে পালানোর কোনো সুযোগ দিতেন না। তার ‘স্কর্চড আর্থ’ পলিসি বা পোড়ামাটি নীতি নিশ্চিত করেছিল যে, ইউরোপীয়রা যেন সিরিয়া বা ফিলিস্তিনের উপকূলে পুনরায় শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে না পারে।
স্থাপত্য ও জ্ঞানচর্চায় এক ভিন্ন বাইবার্স
তলোয়ারের ঝনঝনানির আড়ালে বাইবার্স ছিলেন একজন নিপুণ নির্মাতা ও জনদরদী শাসক। কায়রোতে তার নামে প্রতিষ্ঠিত ‘সুলতান বাইবার্স মসজিদ’ আজও তার স্থাপত্য রুচির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কেবল দুর্গ ও পরিখা খনন করেননি, বরং খাল কেটে কৃষিকাজে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এবং নীল নদের ওপর বিশাল বিশাল সেতু নির্মাণ করেছিলেন। আব্বাসীয় খেলাফত যখন বাগদাদে ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তিনিই কায়রোতে খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংহতি ফিরিয়ে আনেন। তিনি একজন হাফেজে কুরআন ছিলেন এবং ধর্মীয় পণ্ডিতদের মজলিসে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন।
মহাকালের প্রতীক্ষা ও শেষ শিক্ষা
১২৭৭ সালে দামেস্কে যখন এই সিংহহৃদয় বীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন মুসলিম সালতানাতগুলো কেবল নিরাপদই ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি। আজকের ছিন্নভিন্ন ভূ-রাজনীতি আর আর্তনাদের মিছিলে বাইবার্সের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আপস আর দীর্ঘ আলোচনা কখনো মযলুমের মুক্তি বয়ে আনে না। বাইবার্স শিখিয়েছিলেন, যখন শত্রু আপনার ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চেয়ে সাহসের কঠোরতাই বেশি কার্যকর। ইতিহাসের সেই ধ্রুব সত্য আজও প্রাসঙ্গিক। অন্ধকার যখন ঘনীভূত হয়, তখনই কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে এক নতুন বাইবার্সের হুংকার শোনা যায়, যিনি শান্তিকামী মানুষের জন্য তলোয়ার তুলে নিতে দ্বিধা করেন না।