পবিত্র হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই মহান ইবাদতের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে গভীর তাৎপর্য ও শিক্ষণীয় দিক। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল হলো মিনায় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা, যা বাহ্যিকভাবে সহজ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে তাওহীদ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শয়তানের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের শিক্ষা।
হজযাত্রীরা মিনা প্রান্তরে তিনটি নির্দিষ্ট স্থানে—জামারাতুল উলা (ছোট), জামারাতুল উস্তা (মধ্যম) এবং জামারাতুল আকাবা (বড়) — প্রতীকীভাবে শয়তানকে লক্ষ্য করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। যদিও সেখানে বাস্তবে শয়তান উপস্থিত নেই, তবুও এই আমলের মাধ্যমে মুসলমানরা শয়তানের কুমন্ত্রণা, প্রলোভন ও বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন।
হজের দিনপঞ্জি অনুযায়ী ১০ জিলহজ হাজিরা শুধু জামারাতুল আকাবায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এরপর ১১ ও ১২ জিলহজ প্রতিদিন তিনটি জামারায় সাতটি করে মোট ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়। এভাবে তিন দিনে মোট ৪৯টি কঙ্কর নিক্ষেপ সম্পন্ন হয়। প্রতিটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবির উচ্চারণ করা হয়, যা আল্লাহর মহত্বের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।
এই আমলের পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে কোরবানি করতে যাচ্ছিলেন, তখন শয়তান বিভিন্ন স্থানে এসে তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে প্ররোচনা দেয়। কিন্তু ইবরাহিম (আ.) শয়তানের সেই কুমন্ত্রণা উপেক্ষা করে তিনটি স্থানে তাকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে বিতাড়িত করেন এবং আল্লাহর আদেশ পালনে অটল থাকেন।
এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই হজের বিধানে জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তোমরা শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ কর, কারণ তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করছ।’
অতএব, জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের অন্তরের সংগ্রামের প্রতীক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিজেকে দূরে রাখা, নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং আল্লাহর আদেশে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয় এই আমল। হজের এই প্রতীকী কর্ম মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয়— সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হলে প্রতিনিয়ত শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে।