বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হলো ই-কমার্স। বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে এই খাতটি কেবল শহরকেন্দ্রিক বিলাসিতা থেকে বেরিয়ে প্রান্তিক মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৫ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি অনলাইন উদ্যোক্তা রয়েছেন এবং বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ২২,০০০ থেকে ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিশাল খাতের অভিভাবক সংগঠন হিসেবে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) গত ১২ বছর ধরে কাজ করলেও, বর্তমানে সংগঠনটি এক চরম প্রশাসনিক ও নেতৃত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই স্থবিরতা কাটাতে এবং ৫ই আগস্ট পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশে’ ই-কমার্স খাতকে গতিশীল করতে একটি পেশাদার ও অরাজনৈতিক নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
ঐতিহাসিক লড়াই ও ভোটাধিকারের মর্যাদা
ই-ক্যাবের ১২ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কোনো প্রত্যক্ষ নির্বাচন হয়নি; বরং সিলেকশন বা সমঝোতার মাধ্যমেই কমিটি গঠিত হয়েছে। ২০২২ সালে ই-ক্যাবের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়াটা সহজ ছিল না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে দীর্ঘ আলোচনা এবং নির্বাচনের যৌক্তিকতা প্রমাণের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছিল। বিশেষ করে ই-ক্যাবের ফাউন্ডিং মেম্বার সোহেল মৃধা এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মনোনয়ন ফি ৭৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়, যা সাধারণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভোটাধিকারের সুযোগ করে দেয়। সেই সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি প্রমাণ করেছিল যে, সাধারণ সদস্যরা সংগঠনের মালিকানায় প্রকৃত অংশীদার হতে চান।
প্রশাসক বনাম নির্বাচিত নেতৃত্ব: কেন নির্বাচন জরুরি?
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে বর্তমানে ই-ক্যাবে প্রশাসক নিয়োগ করা আছে। আমাদের বুঝতে হবে, প্রশাসকগণ সাধারণত রুটিন বা প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেন; কিন্তু নীয়মনীতি প্রণয়ন বা পলিসি লেভেলে সরকারের উচ্চপর্যায়ে লবিং করার জন্য যে ‘ব্যবসায়িক ম্যান্ডেট’ প্রয়োজন, তা কেবল নির্বাচিত নেতৃত্বের পক্ষেই সম্ভব। গত ১৮ মাসে মেম্বারদের স্বার্থ রক্ষায় বা ই-কমার্সবান্ধব নতুন কোনো পলিসি তৈরিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ার প্রধান কারণ এই ম্যান্ডেটের অভাব। দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসক শাসন এই সৃজনশীল খাতের জন্য স্থবিরতা বয়ে আনছে।
অতীত অনিয়ম ও জবাবদিহিতার সংকট: নতুন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া
ই-ক্যাবের সূচনালগ্ন থেকে বিগত কমিটির সময়কাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী অভিযোগ ছিল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চরম অভাব। তৎকালীন আহ্বায়ক কমিটি থেকে শুরু করে পরবর্তী নির্বাচিত ইসি (EC) পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সংগঠনের আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংগঠনের শীর্ষ পদগুলোকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের ফলে ই-ক্যাব একটি শক্তিশালী পেশাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান নতুন সরকার এবং আগামীতে নির্বাচিত হওয়া নেতৃত্বের কাছে আমাদের জোরালো দাবি থাকবে…
শ্বেতপত্র প্রকাশ ও অডিট: বিগত বছরগুলোতে ই-ক্যাবের অভ্যন্তরে হওয়া সকল আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের একটি স্বচ্ছ ‘অডিট’ পরিচালনা করতে হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
নীতিগত জবাবদিহিতা: ই-ক্যাবকে কেবল নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির ‘প্রভাব বলয়’ থেকে মুক্ত করে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে আনতে হবে, যেখানে প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব সাধারণ সদস্যদের কাছে দৃশ্যমান থাকবে।
নতুন সরকারের তদারকি: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে কেবল প্রশাসক নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, একটি শক্তিশালী তদারকি সেল গঠন করতে হবে যাতে নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো নেতৃত্ব স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
৫ লক্ষ উদ্যোক্তার কণ্ঠস্বর এবং এফ-কমার্স
ই-ক্যাবকে কেবল বড় বড় ইনভেন্টরি-বেজড বা জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর ক্লাব হয়ে থাকলে চলবে না। আমাদের নিবন্ধিত ৩ হাজার মেম্বারের বাইরে থাকা প্রায় ৫ লক্ষাধিক এফ-কমার্স উদ্যোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও ড্রপশিপিং ব্যবসার সাথে জড়িতদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণ, ট্যাক্স হলিডে এবং ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য একটি ‘ব্যবসায়ী বান্ধব’ নির্বাচিত কমিটি প্রয়োজন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার দায়বদ্ধতা কেবল নির্বাচিত নেতৃত্বের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে।
গ্রাহক আস্থা পুনরুদ্ধার ও ‘ই-ক্যাব ট্রাস্টমার্ক’
বিগত বছরগুলোতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের মনে আস্থার এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। এই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন, অনলাইন বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) সেল এবং একটি সর্বজনীন ‘ই-ক্যাব ট্রাস্টমার্ক’ বা ডিজিটাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। যখন একজন নেতা সরাসরি সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন, তখন তিনি সংগঠনের মর্যাদা এবং গ্রাহক আস্থার প্রশ্নে অনেক বেশি দায়বদ্ধ থাকবেন।
অরাজনৈতিক ও মেধাভিত্তিক ‘থিংক ট্যাংক’
৫ই আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ই-ক্যাবকে হতে হবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি মুক্ত একটি পেশাদার সংগঠন। এখানে দলীয় আনুগত্যের চেয়ে ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা ও মেধার মূল্যায়ন হতে হবে সবার আগে। ই-ক্যাবকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে, যা প্রতি বছর বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে সরকারকে নীতিগত সহায়তা দেবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ডিজিটাল অর্থনীতির অবদান জিডিপির ৫% এ উন্নীত করতে হলে ডাটা-চালিত ও গবেষণা-ভিত্তিক নেতৃত্বের বিকল্প নেই।
নতুন সরকারের সাথে রোডম্যাপ প্রণয়ন
১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এই নতুন সরকারের সাথে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতিমালা, সাইবার সিকিউরিটি এবং লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার এখনই মোক্ষম সময়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ই-কমার্স পণ্য পৌঁছে দিতে হলে ই-ক্যাবের একটি বৈধ ও নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি (EC) থাকা এখন অনিবার্য।
ই-ক্যাবকে কেবল কিছু ব্যক্তির ভাগ্য পরিবর্তনের বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না। ৫ লক্ষ প্রান্তিক উদ্যোক্তার অধিকার আদায় এবং একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন ই-কমার্স ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য প্রশাসক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি। মেধাভিত্তিক ও অরাজনৈতিক নেতৃত্বই পারে ই-ক্যাবকে একটি শক্তিশালী পেশাদার সংগঠনে রূপান্তর করতে। সাধারণ সদস্যদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হোক বাংলাদেশের ডিজিটাল সমৃদ্ধির প্রথম ধাপ।
লেখক: কমার্স উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষক