উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের কথা। প্যারিসের এক জমজমাট ক্যাফেতে বসে এক অদ্ভুতদর্শন যুবক কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর খাতায় আঁকিবুঁকি করছেন জটিল সব জ্যামিতিক নকশা। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং নিকোলা টেসলা। টেসলার জীবনের এই সময়টি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তার মস্তিষ্কে তখন ঘুরপাক খাচ্ছে এমন এক ধারণা যা পৃথিবীকে চিরতরে বদলে দিতে পারে। ক্যাফের সেই প্রাণবন্ত আড্ডায় তিনি যখন অন্যান্য উদ্ভাবকদের সঙ্গে বৈশ্বিক বেতার শক্তি নেটওয়ার্ক বা তারহীন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন তার চিন্তার জগৎজুড়ে ছিল কেবল বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ।
সারাহ বার্নহার্ট ও একটি নির্লিপ্ত মুহূর্ত
ঠিক সেই আড্ডার মাঝেই ঘটে এক বিখ্যাত ও কিছুটা মজার ঘটনা। সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী সারাহ বার্নহার্ট সেই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। রূপ আর ব্যক্তিত্বের জাদুতে সারা বিশ্বকে বুঁদ করে রাখা এই অভিনেত্রী টেসলার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার রুমালটি ফেলে দেন। টেসলা অত্যন্ত ভদ্রভাবে রুমালটি তুলে তার হাতে ফিরিয়ে দেন ঠিকই, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সারাহর সেই ভুবনভোলানো আকর্ষণ টেসলাকে এক মুহূর্তের জন্যও বিচলিত করতে পারেনি। তার ধ্যানে তখন নারী নয়, বরং মিশে ছিল তড়িৎচৌম্বকীয় অনুরণন আর শক্তির এক অনন্ত প্রবাহ। একজন সাধারণ মানুষের কাছে যা ছিল মোহনীয় মুহূর্ত, টেসলার কাছে তা ছিল কেবল এক যান্ত্রিক সৌজন্য।
পিরামিড যখন শক্তির আধার
সারাহ বার্নহার্টের সেই রুমাল ফিরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তেও টেসলার ভাবনায় ছিল গিজার গ্রেট পিরামিডের রহস্য। টেসলা বিশ্বাস করতেন, প্রাচীন মিশরের এই বিশাল স্থাপত্যগুলো কেবল রাজাদের সমাধি ছিল না। গণিত আর বিজ্ঞানের এক নিপুণ মিশেলে তৈরি এই পিরামিডগুলোর অবস্থান এবং বিন্যাস টেসলাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার গাণিতিক বিশ্লেষণে ধরা পড়েছিল যে, পিরামিডের নকশা পৃথিবীর কক্ষপথ আর নিরক্ষরেখার সঙ্গে এক বিশেষ অনুপাতে সম্পর্কিত। তিনি মনে করতেন, পিরামিডগুলো আসলে এক বিশাল শক্তি অনুরণক বা এনার্জি রেজোনেটর হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। টেসলার মতে, পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল বৈদ্যুতিক পরিবাহী এবং প্রাচীন প্রকৌশলীরা পিরামিড তৈরির মাধ্যমে পৃথিবীর সেই প্রাকৃতিক কম্পাঙ্ককে কাজে লাগিয়ে শক্তি সঞ্চালনের উপায় জানতেন।
প্রাচীন নকশার আধুনিক প্রতিফলন
প্যারিসের সেই উপলব্ধি টেসলার পরবর্তী জীবনের সব বড় গবেষণার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তার বিখ্যাত ‘ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার’ বা বেতার বিদ্যুৎ টাওয়ারের নকশা করার সময় তিনি পিরামিডের সেই জ্যামিতিক রহস্যকে মাথায় রেখেছিলেন। টেসলার কাছে ৩, ৬ এবং ৯ সংখ্যাগুলো ছিল মহাবিশ্বের চাবিকাঠি, যা তিনি পিরামিডের কোণ এবং আয়তনের মধ্যেও খুঁজে পেতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পিরামিড যেভাবে পৃথিবীর ভূ-তাত্ত্বিক শক্তিকে কেন্দ্রবিন্দুতে ধরে রাখে, তার ট্রান্সমিটারগুলোও ঠিক সেভাবেই আয়নোস্ফিয়ার ব্যবহার করে সারা বিশ্বে বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পারবে। তার কাছে এটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির এক প্রেরণাদায়ক দিশারী।
বিজ্ঞানের অদম্য কৌতুহল
টেসলার এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একজন প্রকৃত উদ্ভাবকের কাছে পার্থিব আকর্ষণ বা গ্ল্যামারের চেয়ে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন অনেক বেশি আনন্দদায়ক। সারাহ বার্নহার্টের সেই রুমাল ফিরিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে পিরামিডের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা। সবকিছুর মূলে ছিল টেসলার এক অদম্য কৌতুহল। তিনি চেয়েছিলেন প্রাচীন জ্ঞান আর আধুনিক প্রযুক্তিকে এক সুতোয় গেঁথে পৃথিবীকে এমন কিছু দিতে, যা আগে কখনো কেউ ভাবেনি। যদিও তার সব স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায়নি, তবুও প্যারিসের সেই ক্যাফে থেকে শুরু হওয়া তার পিরামিড ভাবনা আজও আধুনিক বিজ্ঞানে এবং রহস্যপ্রেমীদের কাছে এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চ হিসেবে টিকে আছে।