ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই উৎসব। তবে এই উৎসবের আবহেও অনেকের হৃদয়ে উঁকি দেয় স্বজন হারানোর শূন্যতা। ঈদের নামাজ শেষ করে যখন সবাই কোলাকুলিতে মত্ত, তখন একদল মানুষ ছুটে যান শহরের বিভিন্ন কবরস্থানে। ধূপ-আগরবাতির ঘ্রাণ নয়, বরং অশ্রুসজল চোখে তারা দাঁড়িয়ে যান মা-বাবা কিংবা প্রিয়জনের কবরের পাশে। তাদের কাছে ঈদের পূর্ণতা যেন নিহিত থাকে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে মোনাজাত করার মধ্যে।
জিয়ারতের তাৎপর্য: পরকালের পথে এক পা
ইসলামি বিধান অনুযায়ী কবর জিয়ারত কেবল একটি আবেগীয় বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এটি মানুষকে দুনিয়ার মোহ কাটিয়ে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তোমাদের আগে কবর জিয়ারতে নিষেধ করেছিলাম, এখন থেকে জিয়ারত করো। কারণ এটি তোমাদের পরকালকে স্মরণ করিয়ে দেবে।’ (সুনানে নাসায়ি)
ঈদের দিনে জিয়ারত করা বাধ্যতামূলক না হলেও, এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এদিন দোয়ার মাধ্যমে মৃত স্বজনদের জন্য আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত কামনা করা হয়, যা জীবিতদের মনেও প্রশান্তি আনে।
সঠিক নিয়ম ও পালনীয় আমল
কবর জিয়ারতের জন্য কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই, তবে জিয়ারতের সময় কিছু শিষ্টাচার মেনে চলা জরুরি।
সালাম ও মাসনুন দোয়া: কবরস্থানে প্রবেশ করে নবীজি (সা.) শিখিয়ে দেওয়া দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত। যার অর্থ- ‘হে মুমিন ও মুসলিম কবরবাসীরা, আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ আমরাও আপনাদের সাথে মিলিত হব।’
কোরআন তেলাওয়াত: কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা, সুরা ইখলাস কিংবা আয়াতুল কুরসি পাঠ করা যায়। তেলাওয়াত শেষে দু’হাত তুলে মৃত ব্যক্তির জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করা শ্রেষ্ঠ আমল।
যা থেকে বিরত থাকা জরুরি
অনেক সময় আবেগের আতিশয্যে আমরা এমন কিছু করি যা শরিয়তসম্মত নয়। কবর জিয়ারতের সময় যা বর্জনীয়…
* বিলাপ করা: কবরের ওপর আছড়ে পড়া বা উচ্চস্বরে কান্না করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
* সিজদা করা: কবরকে সিজদা করা শিরকের শামিল এবং এটি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
* আলোকসজ্জা: কবরের ওপর মোমবাতি বা আগরবাতি জ্বালানোর কোনো ভিত্তি নেই, বরং এটি অপচয়।
* সরাসরি কিছু চাওয়া: কবরবাসীর কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করা যাবে না; চাইতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহর কাছে।
ঈদের এই আনন্দধারার মাঝেও কবর জিয়ারতআমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের নশ্বরতার কথা। আজ যারা কবরের নিভৃত কোণে শায়িত, গত ঈদে হয়তো তারাও আমাদের সাথে হুল্লোড়ে মেতেছিলেন। এই উপলব্ধি আমাদের হৃদয়ে খোদাভীতি ও মানবিকতা জাগ্রত করে। তাই ঈদের খুশির মাঝেও মৃত স্বজনদের জন্য দোয়া করা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।