আকাশে ওড়ার কিছু সময় পর বিশালাকায় একটি উড়োজাহাজ হঠাৎ রাডার থেকে মুছে গেল, আর ১২ বছর কেটে গেলেও তার কোনো হদিস মিলল না। গল্পটি কোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্য মনে হতে পারে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৮ মার্চ মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৩৭০-এর ক্ষেত্রে এটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা। কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া এই বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজটি আধুনিক বিমান চলাচলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক এবং তদন্তকারীদের কাছে আজও এটি এক গোলকধাঁধা।
পিটারের তত্ত্ব এবং বিতর্কের ঝড়
অস্ট্রেলিয়ার শৌখিন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পিটার ম্যাকমোহন একবার দাবি করেছিলেন যে, তিনি গুগল আর্থ ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরের তলদেশে বিমানটির ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করেছেন। তার মতে, বিমানটি সেশেলসের কাছে রাউন্ড আইল্যান্ডের দক্ষিণে বিধ্বস্ত হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক তদন্তকারী দল এবং মালয়েশিয়া সরকার এই দাবিকে শুরুতেই নাকচ করে দেয়। তাদের মতে, পিটারের এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ মনগড়া এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। গবেষকদের মতে, সমুদ্রের তলদেশের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল এবং উপগ্রহ চিত্রে যা ধ্বংসাবশেষ মনে হয়, তা অনেক সময় পাথুরে খাঁজ বা প্রবাল প্রাচীরও হতে পারে।
গবেষক ভিনসেন্ট লিন- এর গবেষনা
তাসমানিয়ার গবেষক ভিনসেন্ট লিন বলেছেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন যে বিমানটি কোথায় রয়েছে তা তিনি খুঁজে পেয়েছেন।
ভিনসেন্ট লিন সম্প্রতি লিঙ্কডইনে একটি পোস্টের মাধ্যমে বিমান নিখোঁজ রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছেন। লিন দাবি করেছেন যে, বিমানটি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্রোকেন রিজের গভীরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভারত মহাসাগরের একটি ২০ হাজার ফুট গভীর গর্ত এই ব্রোকেন রিজ বা ভঙ্গুর মালভূমি। সেই ব্রোকেন রিজের পূর্ব প্রান্ত অত্যন্ত রুক্ষ এবং বিপজ্জনক। অত্যন্ত খাড়াই পাথুরে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা সংকীর্ণ সেই গর্ত পলি দিয়ে ভর্তি। সেখানেই থাকতে পারে নিখোঁজ এমএইচ ৩৭০, এমনই দাবি ভিনসেন্ট লিনের।
অবিলম্বে এই জায়গায় তল্লাশির দাবি করে তিনি বলেন, অনুসন্ধান করা হবে কি না তা অনুসন্ধান সংস্থাগুলির উপর নির্ভর করছে।
ইতিহাসের বৃহত্তম অনুসন্ধান ও শূন্য প্রাপ্তি
এমএইচ৩৭০-এর খোঁজে নেমেছিল এক নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক জোট। আমেরিকা, চীন, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ভিয়েতনাম একযোগে তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে উদ্ধার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভারত মহাসাগরের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে চালানো হয় চিরুনি তল্লাশি। সমুদ্রের চার কিলোমিটার গভীরে নামানো হয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ডুবো যান বা ব্লুফিন-২১। কিন্তু কোটি কোটি ডলার খরচ আর বছরের পর বছর চেষ্টার পরও ফলাফল ছিল শূন্য। ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ আর গভীর অন্ধকার অনুসন্ধানকারীদের বারবার খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে।
রহস্যের নতুন মোড় ও ড্রিফট বিশ্লেষণ
তদন্তের এক পর্যায়ে যখন সাগরের তলদেশে কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন গবেষকরা নতুন এক কৌশলের আশ্রয় নেন যাকে বলা হয় ড্রিফট অ্যানালাইসিস। বিমান নিখোঁজের কয়েক বছর পর মাদাগাস্কার এবং রিইউনিয়ন দ্বীপের সৈকতে বিমানের ডানার কিছু অংশ বা ফ্ল্যাপারন ভেসে আসে। ফরাসি তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেন যে এগুলো এমএইচ৩৭০-এরই অংশ। এই ভাঙা টুকরোগুলো ইঙ্গিত দেয় যে বিমানটি হয়তো মাঝআকাশে ভেঙে পড়েনি, বরং জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর একটি নিয়ন্ত্রিত বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে সাগরে আছড়ে পড়েছিল। তবে মূল কাঠামো বা ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার না হওয়ায় আসল কারণটি এখনো অন্ধকারের আড়ালেই রয়ে গেছে।
অমীমাংসিত প্রশ্নের ভিড়ে বিজ্ঞান
একজন গবেষক হিসেবে যখন এই ঘটনাটি বিশ্লেষণ করা হয়, তখন অনেকগুলো সমীকরণ সামনে আসে। ইনমারস্যাট স্যাটেলাইটের তথ্য অনুযায়ী বিমানটি তার নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে দক্ষিণ দিকে মুখ ঘুরিয়েছিল। কেন বিমানটি মাঝপথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করল, কেনই বা এটি হাজার হাজার মাইল উল্টো পথে উড়ে গেল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অজানা। কেউ একে যান্ত্রিক ত্রুটি বলেন, কেউ বা পাইলটের রহস্যময় আচরণকে দায়ী করেন। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে এগুলো কেবল তত্ত্ব হিসেবেই টিকে আছে। এমএইচ৩৭০ আজও এক বিশাল জলরাশির নিচে বুক চিরে লুকিয়ে রাখা এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেছে।