জে.আর.আর. টোলকিয়েন, যার কলমের ছোঁয়ায় সৃষ্টি হয়েছে ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’ এবং ‘দ্য হবিট’-এর মতো কালজয়ী সব মহাকাব্য। যার কলমের আঁচড়ে তৈরি হয়েছিল আস্ত এক পৃথিবী। সেই পৃথিবীর নাম মিডল-আর্থ। যেখানে বাস করত খাটো আকৃতির হবিট, দীর্ঘদেহী এলফ আর ড্রাগনের মতো ভয়ংকর সব প্রাণী। প্রতি বছর ২৫ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় ‘টোলকিয়েন রিডিং ডে’। এটি কেবল একটি বই পড়ার দিন নয় বরং এটি এমন এক উৎসব যেখানে পাঠকরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা ভুলে পাড়ি জমান ফ্যান্টাসি বা কল্পবিজ্ঞানের এক অনন্য ভুবনে। ২০০৩ সালে দ্য টোলকিয়েন সোসাইটি প্রথম এই দিনটি পালনের উদ্যোগ নেয় যাতে নতুন প্রজন্মের পাঠকরা এই মহান লেখকের সৃষ্টিশীল কাজের সাথে পরিচিত হতে পারে।
কেন ২৫ মার্চ তারিখটিই বেছে নেওয়া হলো
টোলকিয়েনের কালজয়ী সিরিজ দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস যারা পড়েছেন তাদের কাছে এই তারিখটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গল্পের কাহিনী অনুসারে বছরের এই বিশেষ দিনটিতেই সেই ওয়ান রিং বা একচ্ছত্র ক্ষমতার আংটিটি মাউন্ট ডুমের আগুনে ধ্বংস হয়েছিল। এই আংটির ধ্বংসের মাধ্যমেই অন্ধকার শক্তির অধিপতি সৌরভের পতন ঘটে এবং মিডল-আর্থে ফিরে আসে শান্তি। অর্থাৎ অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভর জয়কে স্মরণীয় করে রাখতেই ভক্তরা এই দিনটিকে বেছে নিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো টোলকিয়েনের বইয়ের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই দিনটিই ছিল তাদের নতুন বছরের শুরু বা বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ।
একটি নির্দিষ্ট থিম আর বিশ্বজুড়ে পাঠের আসর
টোলকিয়েন সোসাইটি প্রতি বছর এই দিনটির জন্য একটি আলাদা থিম বা বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেয়। কখনো সেই থিম হয় বন্ধুত্ব আবার কখনো বা সাহস কিংবা প্রকৃতি। ভক্তরা সেই থিমের ওপর ভিত্তি করেই টোলকিয়েনের লেখা দ্য হবিট বা দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস থেকে তাদের প্রিয় অংশগুলো বেছে নেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাইব্রেরিগুলোতে পাঠকরা জড়ো হন। তারা একে অপরকে বইয়ের প্রিয় অনুচ্ছেদগুলো পড়ে শোনান। অনেক জায়গায় আবার ভার্চুয়ালি বড় বড় আড্ডার আয়োজন করা হয় যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ যুক্ত হয়ে টোলকিয়েনের দর্শনের ওপর আলোচনা করেন। এটি পাঠকদের মধ্যে একটি চমৎকার সেতুবন্ধন তৈরি করে।
হবিটদের মতো ভোজ আর সাজসজ্জার ধুম
টোলকিয়েনের গল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র হলো হবিটরা। তারা খেতে খুব ভালোবাসেন এবং দিনে কয়েকবার খাবার গ্রহণ করেন। এই রিডিং ডে-তে অনেক ভক্ত হবিটদের মতো বিশেষ খাবারের মেনু তৈরি করেন। তারা বাড়িতে বসে পাই কিংবা বিশেষ ধরণের কেক বানিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়ন করেন। অনেকে আবার শখের বশে গল্পের চরিত্রগুলোর মতো পোশাক পরে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন। কেউ হয়তো লম্বা আলখাল্লা পরে জাদুকর গ্যান্ডালফ সাজেন আবার কেউ বা ফ্রোডোর মতো কাঁধে ঝোলা নিয়ে বই পড়তে বসেন। এই ছোট ছোট মজার কাজগুলোই দিনটিকে সাধারণ কোনো দিবসের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত করে তোলে।
কাল্পনিক ভাষার চর্চা আর সৃজনশীলতা
টোলকিয়েন কেবল গল্পই লেখেননি তিনি এলভিস বা কুজদুল-এর মতো সম্পূর্ণ নতুন কিছু ভাষাও তৈরি করেছিলেন। এই রিডিং ডে-তে অনেক ভাষা অনুরাগী সেই সব অদ্ভুত ভাষার শব্দগুলো চর্চা করেন। অনেকে টোলকিয়েনের আঁকা মিডল-আর্থের মানচিত্রগুলো পুনরায় অঙ্কন করেন কিংবা নিজের ডায়েরিতে প্রিয় কোনো উক্তি সুন্দর করে লিখে রাখেন। এটি পাঠকদের সৃজনশীলতাকে উসকে দেয় এবং তাদের কল্পনার জগতকে আরও প্রসারিত করে। একটি বই কীভাবে মানুষের চিন্তাধারাকে আমূল বদলে দিতে পারে টোলকিয়েন রিডিং ডে তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চিরন্তন আবেদন আর আগামী দিনের অনুপ্রেরণা
টোলকিয়েনের লেখা বইগুলো কেবল ছোটদের জন্য নয় বরং বড়দের জন্যও এটি জীবন সংগ্রামের এক প্রতিচ্ছবি। সামান্য একজন হবিট কীভাবে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে পুরো পৃথিবীকে রক্ষা করেছিল তা আমাদের বাস্তব জীবনেও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখায়।
শেষকথা
২৫ মার্চের এই রিডিং ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভালো বই কখনো পুরোনো হয় না। ধুলো জমা সেলফ থেকে বইটা নামিয়ে আরও একবার পড়তে বসা মানেই নতুন করে বেঁচে ওঠার আনন্দ পাওয়া। এই দিনটি এভাবেই হাজারো পাঠকের মনে টোলকিয়েনের জাদুকরী সৃষ্টিকে চিরকাল অম্লান করে রাখে।