১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। সেই রাতটি শুধু একটি তারিখ নয় বরং এক জাতির ওপর চালানো নির্মম গণহত্যার সূচনা। ইতিহাসে এই রাতটি পরিচিত ‘কালরাত’ নামে। আর সেই অন্ধকার ভেদ করেই ২৬ মার্চের ভোরে শুরু হয় স্বাধীনতার নতুন অধ্যায়।
কালরাতের নির্মমতা
২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পূর্বপরিকল্পিত সামরিক অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একযোগে হামলা চালানো হয়।
ঢাকার রাজপথ, আবাসিক এলাকা, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চালানো হয় বর্বরতম হামলা। শিক্ষক, ছাত্র, কর্মচারী কেউই রক্ষা পাননি। ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন হলে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। রাতভর আগুনে জ্বলতে থাকে শহর আর চারদিকে শোনা যায় আর্তনাদ।
পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও চলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে ঘর থেকে টেনে বের করে হত্যা করা হয়। সেই রাতে নিহতের সঠিক সংখ্যা আজও অজানা। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল পরিকল্পিত গণহত্যা।
গ্রেপ্তার ও প্রতিরোধের সূচনা
সেই রাতেই পাকিস্তানি সেনারা জাতির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। তবে গ্রেপ্তারের আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধের আগুন। সাধারণ মানুষ, পুলিশ, ইপিআর সদস্য এবং ছাত্ররা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেন।
২৬ মার্চের ভোর: নতুন দিনের সূচনা
কালরাতের বিভীষিকা শেষে ২৬ মার্চের ভোর আসে এক নতুন বার্তা নিয়ে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতার ঘোষণা। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করা হয়। যা দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘোষণাই বাঙালি জাতিকে সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। শুরু হয় নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। যার মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
ইতিহাসের শিক্ষা
২৫ মার্চের কালরাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কোনো সহজলভ্য অর্জন নয়। লাখো শহীদের রক্ত আর অসংখ্য মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা।
অন্যদিকে ২৬ মার্চের সকাল বাঙালির আত্মপরিচয়ের সূচনা। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের ঘোষণা। প্রতি বছর এই দিনগুলো আমাদের নতুন করে শপথ নিতে শেখায়। স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার।
২৫ মার্চের অন্ধকার আর ২৬ মার্চের আলো এই দুইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের জন্মকথা। একদিকে ভয়াবহতা, অন্যদিকে অদম্য সাহস ও প্রত্যয়ের গল্প। ইতিহাসের এই অধ্যায় যতবার স্মরণ করা হবে, ততবারই জাগ্রত হবে বাঙালির স্বাধীনতার চেতনা।