ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু শহর আছে যা তার সমৃদ্ধির চেয়ে ধ্বংসের কারণেই বেশি অমর হয়ে আছে। ইতালির নেপলস উপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন রোমান শহর পম্পেই তেমনই এক নাম। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ বা সপ্তম শতকে ওস্কানদের হাতে গড়ে ওঠা এই শহরটি রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বিলাসবহুল অবকাশ যাপন কেন্দ্র এবং বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ৭৯ খ্রিস্টাব্দের এক অভিশপ্ত দুপুরে প্রকৃতির এক প্রলয়ঙ্কারী রূপ এই শহরটিকে চিরতরে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেয়। মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির সেই ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত পম্পেইকে ধ্বংস করেনি, বরং কয়েক হাজার টন উত্তপ্ত ছাই আর লাভার নিচে কয়েক হাজার বছর ধরে এক অদ্ভুত উপায়ে সংরক্ষিত করে রেখেছিল।
ভিসুভিয়াসের সেই কালরাত এবং প্রকৃতির তাণ্ডব
৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্ট (মতান্তরে অক্টোবর), দীর্ঘদিনের সুপ্ত অবস্থা ভেঙে হঠাৎ জেগে ওঠে মাউন্ট ভিসুভিয়াস। স্থানীয় বাসিন্দারা আগ্নেয়গিরির পাশের ছোট ছোট কম্পন বা ধোঁয়াকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, কারণ ভিসুভিয়াস যে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি হতে পারে তা তাদের ধারণার বাইরে ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী প্লিনি দ্য ইয়াঙ্গার-এর বিবরণ অনুযায়ী, আকাশ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায় এবং আকাশচুম্বী এক বিশাল ছাইয়ের মেঘ দেখা দেয়। পরবর্তী ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা ধরে শহরটির ওপর অবিরাম গরম পাথর এবং ছাইয়ের বৃষ্টি হতে থাকে। প্রায় ২০ ফুট পুরু ছাই আর লাভা পাথরের নিচে ঢাকা পড়ে যায় পুরো শহর। আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত গ্যাস এবং লাভার তীব্র স্রোতে (পাইরোক্লাস্টিক ফ্লো) কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শহরের কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।
ছাইয়ের নিচে থমকে যাওয়া এক জীবন্ত চিত্রশালা
পম্পেই শহরটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর ধ্বংসাবশেষের সংরক্ষণ পদ্ধতি। উত্তপ্ত ছাই যখন শহরের ওপর পড়েছিল, তখন সেটি বাতাস আটকে দিয়ে এক ধরণের শূন্যস্থান তৈরি করেছিল। এতে করে দালানকোঠা, আসবাবপত্র, এমনকি মানুষের দেহও পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। ১৭৪৮ সালে যখন প্রথম এই শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়, তখন দেখা যায় শহরের রাস্তাঘাট, থিয়েটার, বাজার এবং বাড়ির দেয়ালের চিত্রগুলো প্রায় অক্ষত আছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা যখন ছাইয়ের স্তরের নিচে গর্ত খুঁজে পান, তখন সেখানে তরল প্লাস্টার ঢেলে তৈরি করেন হুবহু সেই সব মানুষের আদল, যারা মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে যে অবস্থায় ছিলেন ঠিক সেভাবেই পাথরের মূর্তির মতো জমে আছেন। কেউ হয়তো ঘুমাচ্ছিলেন, কেউ হাত দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলেন, আবার কেউ প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন।
রোমান আভিজাত্য এবং নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি
খননকাজের ফলে পম্পেই থেকে যা পাওয়া গেছে তা প্রাচীন রোমান জীবনযাত্রা বোঝার জন্য শ্রেষ্ঠ উৎস। শহরটিতে ছিল আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সুপ্রশস্ত রাস্তা, ব্যায়ামাগার এবং বিশাল অ্যাম্পিথিয়েটার যেখানে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই হতো। বিত্তশালীদের বাড়িগুলোতে ছিল চমৎকার ফ্রেস্কো পেইন্টিং এবং মোজাইক করা মেঝে। পম্পেই ছিল মূলত একটি উৎসব ও বাণিজ্যের শহর। সেখানে রুটির কারখানা থেকে শুরু করে মদের দোকান এবং কাপড়ের কল, সবই পাওয়া গেছে। দেয়ালে দেয়ালে পাওয়া গেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারণার লিপি এবং সাধারণ মানুষের আঁকা সব মজার গ্রাফিতি, যা প্রমাণ করে সেই সময়ের মানুষ কতটা সামাজিক ও আমুদে ছিল।
আধুনিক যুগের শিক্ষা ও সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে পম্পেই ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং ইতালির অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। তবে এই শহরটি সংরক্ষণ করা এখন গবেষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বায়ুদূষণ, বৃষ্টি এবং লাখ লাখ পর্যটকের আনাগোনায় এই ভঙ্গুর কাঠামো দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাসত্ত্বেও পম্পেই আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের সৃষ্টি কতটা অসহায়। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই অভিশপ্ত অথচ বিস্ময়কর শহরটি দেখতে ভিড় জমান কেবল সেই থমকে যাওয়া ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার জন্য। ছাইচাপা পড়া এই শহরটি আসলে একটি মৃত নগরী নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক জ্যান্ত দলিল যা হাজার বছর ধরে আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে।