Sunday 12 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পাহাড়ের প্রাণে নববর্ষের রঙ, আজ ‘ফুল বিজু’

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১২ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৬

চৈত্রের শেষ বিকেলে পাহাড়ে যখন আলো নরম হয়ে আসে, বাতাসে ভেসে ওঠে ফুলের গন্ধ, তখনই শুরু হয় এক অন্যরকম প্রস্তুতি। নতুন বছরকে বরণ করার সেই আয়োজন, যার নাম বিজু। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, পার্বত্য জনপদের এই উৎসব যেন প্রকৃতি আর মানুষের এক নিখাদ মিলনমেলা।

পহেলা বৈশাখের সঙ্গে তাল মিলিয়েই পাহাড়ে পালিত হয় বিজু মূলত চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর অন্যতম বড় উৎসব। তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রতিটি দিনেই আছে আলাদা রঙ, আলাদা আবেগ, আলাদা গল্প।

ফুল বিজু: বিদায়ের ভেতরেই স্বাগত

প্রথম দিন ফুল বিজু। ভোরের আলো ফোটার আগেই কিশোর-কিশোরীরা ঝুড়ি হাতে বেরিয়ে পড়ে। পাহাড়ি পথ ধরে বুনো ফুল সংগ্রহ তারপর সেগুলো ভাসানো হয় নদী বা ঝরনার জলে।
এই ফুল ভাসানো শুধু রীতি নয়, এক ধরনের প্রতীক।পুরোনো বছরের সব দুঃখ, ক্লান্তি, কষ্টকে বিদায় জানানো। আর সেইসঙ্গে নতুন বছরের জন্য প্রার্থনা, সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধির।

বিজ্ঞাপন

মূল বিজু: ঘরে ঘরে আনন্দের রান্না

দ্বিতীয় দিন মূল বিজু উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। এই দিন ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা রকম ঐতিহ্যবাহী খাবার, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাজন অনেক ধরনের শাকসবজি মিশিয়ে রান্না করা এক বিশেষ পদ।

পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া সব মিলিয়ে এক উষ্ণ সামাজিক বন্ধনের দিন। পাহাড়ের প্রতিটি ঘর যেন তখন উৎসবের আলোয় ভরা।

গোজ্যেপোজ্যে দিন: নতুন বছরের প্রথম সকাল

তৃতীয় দিন গোজ্যেপোজ্যে দিন- নতুন বছরের প্রথম দিন। এদিন বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান জানানো, আশীর্বাদ নেওয়া এবং মন্দিরে প্রার্থনা করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন বছরের যাত্রা। পাহাড়ি তরুণীরা পরেন রঙিন পিনন-হাদি, তরুণরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে ওঠে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক প্রশান্ত, নির্মল আনন্দ।

উৎসবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নাম রহস্য

বিজু কবে থেকে শুরু হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো সাল বা তারিখ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই। তবে নৃতাত্ত্বিকদের মতে, এটি কয়েকশ বছরের পুরনো এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য। পাহাড়ী মানুষের কৃষিনির্ভর ‘জুম চাষ’ ব্যবস্থার সাথে এই উৎসব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জুমের ফসল ঘরে তোলা এবং নতুন ঋতুতে নতুন করে বীজ বপনের যে জীবনচক্র, তা থেকেই এই উৎসবের সূচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। চাকমা লোকগাথা ও ভাষাতত্ত্ব অনুযায়ী, ‘বিজু’ শব্দটি এসেছে ‘বিশু’ বা ‘বিষুব’ সংক্রান্তি থেকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় সূর্য যখন বিষুব রেখায় অবস্থান করে এবং দিন-রাত্রি সমান হয়, সেই সন্ধিক্ষণটিকেই পাহাড়ী পূর্বপুরুষরা উৎসবের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে এটি চৈত্র সংক্রান্তির বিদায় এবং বৈশাখের আগমনের সাথে মিশে আছে।

বিজুর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও মানবিক আবেদন

বিজু কেবল খাওয়া-দাওয়া বা সামাজিক মিলনের উৎসব নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর জীবনদর্শন। এটি মূলত ক্ষমা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সময়। বিগত বছরের যাবতীয় দুঃখ, কষ্ট এবং মনের ভেতরে পুষে রাখা ক্ষোভ ভুলে গিয়ে মানুষ একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে। উৎসবের অন্যতম সুন্দর অংশ হলো বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তরুণরা নদী থেকে পবিত্র জল এনে প্রবীণদের গোসল করিয়ে দেয় এবং তাদের আশীর্বাদ গ্রহণ করে। পহেলা বৈশাখের দিনটিতে কোনো কাজ না করে সাধারণত বিশ্রাম নেওয়া হয় এবং বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা হয়। এই উৎসব আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে প্রকৃতির সাথে মিশে থেকে পুরোনো গ্লানি মুছে ফেলে নতুন আগামীর দিকে এগিয়ে যেতে হয়।

বিজু আর পহেলা বৈশাখ: আলাদা সুর, এক আবেগ

পহেলা বৈশাখ মানেই শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশ আর লাল-সাদা সাজ। আর পাহাড়ে বিজুর ফুল, পাজন আর নাচগান। দুই উৎসবের ধরন আলাদা হলেও, অন্তরের অনুভূতি এক পুরোনোকে বিদায়, নতুনকে স্বাগত।
বিজু যেন মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের বৈচিত্র্যই তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। একই আকাশের নিচে, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক রঙিন পরিচয়।

প্রকৃতি, মানুষ আর উৎসবের এক অনবদ্য গল্প

বিজু শুধু একটি উৎসব নয়, এটি জীবনযাপনের একটি অংশ, একটি ঐতিহ্য, একটি পরিচয়। পাহাড়ের মানুষের হাসি, তাদের সরলতা আর প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, সবকিছু মিলিয়ে বিজু হয়ে ওঠে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

নতুন বছরের এই সময়ে, যখন শহর আর পাহাড় দুটোই আলাদা সুরে বাজে তখন মনে হয়, বৈচিত্র্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে আমাদের সত্যিকারের একতা।

বিজু তাই শুধু পাহাড়ের নয় এটি পুরো বাংলাদেশের এক অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর