বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের রাজকীয় এলাকা এবং নিচু শহরের মধ্যবর্তী সংযোগস্থলে অবস্থিত ‘মন্ট ডেস আর্টস’ বা ‘শিল্পের পাহাড়’। এটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং ব্রাসেলসের সবচেয়ে সুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন বাগান ও স্থাপত্যের এক অনন্য সমন্বয়। উনিশ শতকের শেষভাগে রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের হাত ধরে এই এলাকাটির আধুনিকায়নের সূচনা হয়। শহরের উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে তাকালে বাগান, ফোয়ারা এবং দূরে সিটি হলের সুউচ্চ মিনার মিলে যে অপার্থিব দৃশ্য তৈরি হয়, তা ইউরোপের আর খুব কম শহরেই দেখা যায়। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এবং আলোকচিত্রী এখানে ভিড় করেন ব্রাসেলসের সবচেয়ে চমৎকার সূর্যাস্তটি দেখার জন্য।
ইতিহাসের বিবর্তন ও স্থাপত্যের রূপান্তর
মন্ট ডেস আর্টসের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। মধ্যযুগে এলাকাটি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ, কিন্তু রাজা লিওপোল্ড এই স্থানটিকে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা করেন। ১৯১০ সালের বিশ্ব প্রদর্শনীর ঠিক আগে এলাকাটি পরিষ্কার করে প্রথমবার বাগান তৈরি করা হয়েছিল। তবে বর্তমানের জ্যামিতিক নকশার সুবিন্যস্ত বাগানটি ১৯৫০-এর দশকে স্থপতি রেনে পেকহেরে কর্তৃক সংস্কার করা হয়। বাগানের চারপাশে ঘিরে থাকা ভবনগুলো আধুনিক এবং ধ্রুপদী স্থাপত্যের এক সংমিশ্রণ, যা ব্রাসেলসের ঐতিহাসিক আভিজাত্যকে ধরে রেখেছে। বিশেষ করে মন্ট ডেস আর্টসের আর্চওয়ে বা খিলানগুলো এই এলাকাটিকে এক ধরনের রাজকীয় গাম্ভীর্য প্রদান করে।

জ্ঞানের আধার এবং জাদুঘরের সমারোহ
এই পাহাড় সদৃশ এলাকাটি ব্রাসেলসের প্রধান প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র। মন্ট ডেস আর্টসের একেবারে পাশেই অবস্থিত বেলজিয়ামের রয়্যাল লাইব্রেরি, যেখানে সংরক্ষিত আছে লক্ষ লক্ষ ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি ও নথি। এছাড়াও এর আশেপাশে রয়েছে বিখ্যাত ‘মিউজিয়াম অফ ফাইন আর্টস’ এবং ‘মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস মিউজিয়াম’। এই ভবনগুলোর অবস্থান এলাকাটিকে আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘সাংস্কৃতিক পার্কে’ পরিণত করেছে। পর্যটকরা এখানে যেমন ইতিহাসের গন্ধ পান, তেমনি স্থাপত্যের বিশালতা দেখে মুগ্ধ হন। বাগানের ঠিক ওপরেই বেলজিয়ামের রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের ভাস্কর্যগুলো এই চত্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আলোকচিত্রীদের স্বর্গরাজ্য ও শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য
মন্ট ডেস আর্টসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এখান থেকে ব্রাসেলসের দিগন্তরেখা বা স্কাইলাইন দেখা। বাগানের ওপরের দিকের চত্বরে দাঁড়ালে গ্র্যান্ড প্লেসের টাউন হল টাওয়ারটি স্পষ্ট দেখা যায়। পরিষ্কার আকাশ থাকলে অনেক দূর পর্যন্ত শহরের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এই স্থানে বসানো বাগান এবং ফোয়ারাগুলোর জ্যামিতিক নকশা আকাশ থেকে বা উঁচু কোনো স্থান থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো শিল্পী সুনিপুণভাবে ক্যানভাসে ছবি এঁকেছেন। রাতের আলোতে যখন ফোয়ারাগুলো জ্বলে ওঠে এবং আশেপাশের ভবনগুলো আলোকিত হয়, তখন মন্ট ডেস আর্টস এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। ব্রাসেলস ভ্রমণে আসা যেকোনো পর্যটকের কাছে এটি তাই এক অবিচ্ছেদ্য গন্তব্য।
প্রচ্ছদের ছবি: সংগৃহীত
ভেতরের ছবি: লেখক