সন্তান আল্লাহ তায়ালার দেয়া অন্যতম বড় নিয়ামত ও অনুগ্রহ। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এই নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জীবনসঙ্গীদের মাধ্যমে তোমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনি দিয়েছেন। আর তোমাদের পবিত্র ও উত্তম রিজিক দান করেছেন। তবু কি তারা মিথ্যার ওপর ঈমান আনে এবং আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়? (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৭২)
মুসলিম হিসেবে সন্তানদের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক কল্যাণের যত্ন নেয়া আমাদের দায়িত্ব। শিশুদের সুস্থ, নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। মহানবী সা. একটি হাদিসে বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সহিহ বুখারি)।
সন্তানসহ যাদের দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে, তাদের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বের কথা এই হাদিসে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে।
সন্তানের জন্য পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় যত্ন ও শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জন্য দোয়া করাও আমাদের দায়িত্বের অংশ। সন্তান লালন-পালনে নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও শেষ পর্যন্ত হেদায়াত ও সাহায্যের জন্য আমরা আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভর করি। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, তিনটি দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ১. মজলুমের দোয়া, ২.মুসাফিরের দোয়া এবং ৩. সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া। (সুনান আত-তিরমিজি)
সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসুলের (সা.) হাদিসটি সন্তানদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। সন্তানের সুরক্ষা, কল্যাণ ও হেদায়াতের জন্য করা যায় এমন কিছু দোয়া…
সন্তানকে ক্ষতি ও বদনজর থেকে রক্ষার দোয়া
আমরা সর্বদা রক্ষাকারী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ তায়ালার কাছে সুরক্ষা চাই। মহানবী (সা.) তার নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এই দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন।
উচ্চারণ: আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং সব ক্ষতিকর ও হিংসুকের বদনজর থেকে আশ্রয় চাই। (সহিহ বুখারি)
এই দোয়ায় শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী ও বদনজর থেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে।
সন্তানসহ যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তির জন্য এই দোয়া করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে এই দোয়া পড়তেন:
উচ্চারণ: আযহিবিল-বা-সা রাব্বান-নাস, ওয়াশফি আনতাশ-শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা।
অর্থ: হে মানুষের প্রতিপালক, রোগ-ব্যাধি দূর করে দিন। আরোগ্য দান করুন, আপনিই তো আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না। (সহিহ বুখারি)
উপযুক্ত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার পাশাপাশি আমরা আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করতে পারি এবং মনে রাখতে পারি, শেষ পর্যন্ত সব আরোগ্য তার পক্ষ থেকেই আসে।
সন্তানকে চোখের শীতলতা ও নেককার হওয়ার জন্য দোয়া
উচ্চারণ: রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইউনিন, ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান। (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
এই দোয়ায় শুধু এমন নেক সন্তান কামনা করা হয়নি, যারা আমাদের চোখের শীতলতা হবে; বরং নিজেদের ও অন্যদের জন্য ভালো উদাহরণ হওয়ার সামর্থ্য দেওয়ার জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।
সন্তানের সফলতার জন্য দোয়া
নেক সন্তান লাভের জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ তায়ালার কাছে এই দোয়া করেছিলেন। এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সন্তানদের জন্য কাঙ্ক্ষিত সফলতা শুধু পড়াশোনা বা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঈমান ও নেককারিতার দিক থেকেও তাদের বেড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চারণ: রাব্বি হাব লি মিনাস-সালিহিন।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নেককার সন্তান দান করুন। (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত:১০০)
সন্তানকে নামাজে অবিচল রাখার দোয়া
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের নামাজে উৎসাহিত করা এবং ধীরে ধীরে নামাজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বোঝানো উচিত। নামাজে অবিচলতার তাওফিক পেতে আল্লাহর কাছে নিজের ও সন্তানদের জন্যও এই দোয়া করা যেতে পারে:
উচ্চারণ: রাব্বিজআলনি মুকিমাস-সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি, রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুয়াআ।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের প্রতিপালক, আমার দোয়া কবুল করুন। (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪০)
কঠিন সময়ে সন্তানের জন্য দোয়া
সন্তানদের জন্য এই সাধারণ দোয়াটি পড়া যায় এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে তাদেরকেও এই দোয়া পড়তে শেখানো যায়।
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা জাআলতাহু সাহলান, ওয়া আনতা তাজআলুল হাজনা ইজা শিতা সাহলা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি যা সহজ করে দেন তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আপনি চাইলে কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দিতে পারেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান)
সন্তানের ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের জন্য দোয়া
মুসলিম বাবা-মা হিসেবে আমরা চাই, আমাদের সন্তানদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালা এবং তার রাসুল (সা.)-এর প্রতি প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা গড়ে উঠুক। একই সঙ্গে তারা যেন সারা জীবন ঈমানের ওপর অবিচল থাকে, সেটিও আমাদের কামনা। সন্তানের ঈমান ও আল্লাহর প্রতি অনুগত্যের জন্য এই দোয়াটি করতে পারেন সচেতন মা-বাবা।
উচ্চারণ: রাব্বানা ওয়াজআলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিন জুররিয়্যাতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতাল্লাক, ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়া তুব আলাইনা ইন্নাকা আনতাত-তাওয়াবুর-রাহিম।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুজনকে আপনার অনুগত বানান এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকেও আপনার অনুগত একটি জাতি সৃষ্টি করুন। আমাদের ইবাদতের নিয়মাবলি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১২৮)
এই দোয়াটি আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয়, সন্তানদের ঈমানের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি নিজেদেরও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করতে হবে।
কৃতজ্ঞ হওয়ার জন্য দোয়া
উচ্চারণ: রাব্বি আওযিনি আন আশকুরা নিমাতাকাল্লাতি আনআমতা আলাইয়া ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়া ওয়া আন আমালা সালিহান তারদাহু, ওয়া আসলিহ লি ফি জুররিয়াতি, ইন্নি তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল-মুসলিমিন।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমার ও আমার বাবা-মায়ের প্রতি যে নিয়ামত দান করেছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামর্থ্য আমাকে দিন। আর এমন সৎকাজ করার তাওফিক দিন, যা আপনি পছন্দ করেন। আমার সন্তানদের আমার জন্য সংশোধন করে দিন। নিশ্চয়ই আমি আপনার কাছে তওবা করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। (সুরা আহকাফ, আয়াত: ১৫)
এই দোয়ায় কৃতজ্ঞতা, নেক আমল ও সন্তানদের নেককার হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে সুন্দরভাবে একত্র করা হয়েছে। এই দোয়ায় আল্লাহ তায়ালার নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকার পাশাপাশি তার সন্তুষ্টির জন্য কাজ করার এবং সন্তানদের নেককার হওয়ার জন্য দোয়া করার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নেক সন্তান লাভের দোয়া
হজরত জাকারিয়া (আ.) আল্লাহ তায়ালার কাছে উত্তম সন্তান লাভের জন্য আন্তরিকভাবে এই দোয়া করেছিলেন।
উচ্চারণ: রাব্বি হাব লি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান তইয়্যিবাতান, ইন্নাকা সামিউদ-দুআ।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আপনার পক্ষ থেকে আমাকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮)
এই দোয়াগুলোর পাশাপাশি আমরা নিজেদের ভাষায়ও সন্তানদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করতে পারি এবং তাদের জন্য যা কল্যাণকর, তা আল্লাহর কাছে চাইতে পারি।