ইসলাম ধর্মের আলোয় নিজের জীবনকে আলোকিত করতে প্রতিটি মুসলিমের জন্য প্রধান দুটি দিশারী হলো কোরআন মাজিদ ও সুন্নাহ। আল্লাহর কালাম কোরআন আমাদের সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখায়, আর সেই শিক্ষাগুলোকে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে ধাপে ধাপে রূপ দিতে হবে, তার বাস্তব মানচিত্র একে দিয়েছেন মহানবী (সা.)। সরল কথায়, কোরআন হলো ইসলামের জীবনবিধান, আর হাদিস হলো সেই বিধান মেনে চলার নিখুঁত নির্দেশিকা। তাই হাদিসের আলোকপাত ছাড়া কোরআনের মূল সুর অনুধাবন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সুন্নাহ বা হাদিস আসলে কী?
ইসলামি পরিভাষায় ‘সুন্নাহ’ বা ‘হাদিস’ বলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত বাণী, তার কাজ এবং তার উপস্থিতিতে কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার পর তাতে দেওয়া নীরব অনুমোদনকে বোঝায়।
ইসলামি শরিয়তের বিধানে কোরআনের পরই হাদিসের অবস্থান। বস্তুত হাদিস ছাড়া যেমন কোরআনের প্রতিটি বিধানের বিস্তারিত রূপ বোঝা সম্ভব নয়, তেমনি কোরআনকে পাশে রেখে হাদিসের ব্যাখ্যা না করলেও তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না।
কোরআন ও হাদিসের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক
কোরআন হলো শরিয়তের তাত্ত্বিক রূপ, আর হাদিস হলো তার প্রয়োগিক ব্যাখ্যা। আল্লাহ তাআলা যে বার্তা মানবজাতির জন্য পাঠিয়েছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের জীবন দিয়ে তা মানুষের সামনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন।
রাসুলের ঐশ্বরিক দায়িত্ব
মহানবী (সা.)-এর দায়িত্ব কেবল বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সেই বাণীর গভীর ব্যাখ্যা দেওয়া এবং তা কীভাবে মানতে হবে তা হাতে-কলমে দেখিয়ে দেওয়াও ছিল তার ওপর অর্পিত মহা দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব কেবল তারই, আর তোমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব তোমাদের। তোমরা যদি তার আনুগত্য করো, তবেই সঠিক পথ পাবে। আর রাসুলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে বার্তা পৌঁছে দেওয়া।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত: ৫৪)
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, রাসুল (সা.)-এর নির্দেশাবলি জানা ও অনুসরণ করা মুমিনের জন্য জরুরি।
কেন হাদিস জানতেই হবে?
কোরআনে আল্লাহ তাআলা সংক্ষেপে এবং নীতিগতভাবে অনেক নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলোর পদ্ধতি বা বিস্তারিত রূপ পাওয়া যায় হাদিসে।
ইবাদতের নিয়মাবলী: যেমন, কোরআনে বারবার নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কীভাবে রুকু-সিজদা করতে হবে, কত রাকাত পড়তে হবে-তার বিস্তারিত নিয়ম কোরআনে নেই। একইভাবে রোজা, জাকাত বা হজের সঠিক নিয়ম আমরা হাদিস থেকেই লাভ করি।
ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট (শান-এ-নুজুল): কোরআনের অনেক আয়াত একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছিল। যেমন, সুরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতে ‘মুবাহালা’ বা মিথ্যুকদের ওপর অভিশাপ কামনার যে কথা বলা হয়েছে, তা নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক বিতর্কের পটভূমিতে বোঝা আবশ্যক। এই প্রেক্ষাপট না জানলে আয়াতের আসল মাহাত্ম্য ধরা পড়ে না।
রাসুলের আনুগত্য ও আদর্শ গ্রহণ
কোরআনে বলা হয়েছে, রাসুলের ফায়সালাই চূড়ান্ত। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন:
‘কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেদের পারস্পরিক বিরোধের ক্ষেত্রে আপনাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়, (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১৯৬৫)
রাসুল (সা.)-এর এই বিচার ও সিদ্ধান্তসমূহ সংরক্ষণের মাধ্যমই হলো হাদিস। যখন হজরত আয়েশা (রা.)-কে নবীজি (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কোরআনই ছিল তার চরিত্র।’ অর্থাৎ, কোরআনের জীবনন্ত রূপ ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)।
জীবনের চলার পথে হাদিসের তাগিদ
কোরআন যদি হয় একটি মহৎ ভাবনার রূপরেখা, তবে হাদিস হলো সেই রূপরেখাকে জীবন্ত করে তোলার চালিকাশক্তি। মহানবী (সা.)-এর প্রদর্শিত সুন্নাহকে দূরে ঠেলে শুধু নিজের খেয়ালখুশি মতো কোরআনের অর্থ করতে গেলে পথভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। অতএব, দ্বীনের সঠিক পথ আঁকড়ে ধরে চলতে কোরআনের আমল ও হাদিসের সুদৃঢ় ভিত্তিকে একসাথে আঁকড়ে ধরাই চূড়ান্ত সফলতার মূল চাবিকাঠি।